দুর্ঘটনায় দু-চোঁখ অন্ধ হলেও হার মানেনি রুবিনা শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছে 

দুর্ঘটনায় দু-চোঁখ অন্ধ হলেও হার মানেনি রুবিনা শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছে 

চোখে দেখে না,তবু স্বপ্ন দেখে শিক্ষক হওয়ার। ২০২৩ সালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারানো সানজিদা আক্তার রুবিনা এবছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.০৬ পেয়েছেন। ডান হাত ও বাম পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও থেমে যায়নি তার পড়াশোনা। চোখে না দেখেও সহপাঠীদের পাশে বসে শিক্ষকদের পাঠ শুনেছে। পরীক্ষার হলে মুখে উত্তর বলেছে, আর শ্রুতিলেখক সেই উত্তর লিখে দিয়েছে খাতায়। প্রথমবার একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও হাল ছাড়েনি, দ্বিতীয়বার সে পরীক্ষা দিয়ে সফল হয়েছেন।

তবে সাফল্যের এই আনন্দের মধ্যেই রুবিনার সামনে এখন নতুন শঙ্কা—অর্থের অভাবে কি থেমে যাবে তার উচ্চশিক্ষা? দিনমজুর বাবার পাঁচ সদস্যের সংসারে যেখানে নিত্যদিনের খরচ চালানোই কঠিন, সেখানে মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার। রুবিনার স্বপ্ন, পড়াশোনা শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণে সরকারি ও সমাজের মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে সে।

সানজিদা আক্তার রুবিনা ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও ইউনিয়নের ধরগাঁও চকপাড়া গ্রামের দিনমজুর রুবেল মিয়ার মেয়ে। ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা অন্যদের সঙ্গে ইজিবাইকে করে মুশুল্লী বালিকা বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে দ্রুতগতির একটি বাস ইজিবাইকটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। গুরুতর আহত রুবিনাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মেয়ের জীবন বাঁচাতে সহায়-সম্বল বিক্রি করে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করান বাবা রুবেল মিয়া। প্রায় এক বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফিরলেও চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারায় রুবিনা। দুর্ঘটনায় গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার ডান হাত ও বাম পা।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে পড়াশোনা থেকে দূরে রাখতে পারেনি। পরিবারের সদস্যদের রাজি করিয়ে আবার স্কুলে ফেরে সে। চোখে দেখতে না পেলেও সহপাঠীদের পাশে বসে শিক্ষকদের পাঠ শুনে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। এসএসসি পরীক্ষার হলে একই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তার শ্রুতিলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

ফল প্রকাশের পর আবেগাপ্লুত রুবিনা আক্তার বলেন, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। মা-বাবা, সহপাঠী ও শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমার মনে একটাই চিন্তা—আমি কি আরও পড়তে পারব? আমার দিনমজুর বাবার পক্ষে কি সেটা সম্ভব?

রুবিনা বলেন,সরকারিভাবে যদি সহযোগিতা পাই, তাহলে পড়াশোনা শেষ করে অন্তত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাই। আমার এই স্বপ্ন পূরণে সমাজের মানুষের সহযোগিতা চাই।

রুবিনার মা রুমা আক্তার বলেন,মেয়েটা পাস করেছে, সে পড়তে চায়। আমাদের ঘরের জায়গাটুকু ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। পাঁচজনের সংসার কোনোভাবে চলে। আমার স্বামী স্থানীয় একটি বাজারে পুরি-সিঙ্গারা বিক্রি করে যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার চলে। মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব।

রুবিনার বাবা রুবেল মিয়া (৪২) বলেন, মেয়েটা দুর্ঘটনায় পড়ার পর সহায়-সম্বল সব শেষ হয়ে গেছে। অনেকেই তখন সহযোগিতা করেছেন। এখন ১২ বছরের ছেলেকে নিয়ে পুরি-সিঙ্গারা বিক্রি করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছি। মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব, বুঝতে পারছি না।

মুশুল্লি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিরুল আমিন রাসেল বলেন, রুবিনা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও পড়াশোনার প্রতি যে অদম্য আগ্রহ দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার স্বপ্ন পূরণে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, রুবিনার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

সর্বশেষ সংবাদ

1 2 3 30