অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, আমাদের করণীয়- মোঃ মাসুদ মিয়া
জুলাই ১৪ ২০২৬, ২২:০২
একসময় বর্ষা ছিল বাংলার প্রাণের ঋতু। আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি কৃষকের মাঠে নতুন স্বপ্ন বুনত, নদী-নালা ফিরে পেত প্রাণ, প্রকৃতি সেজে উঠত সবুজের অপরূপ সৌন্দর্যে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে বর্ষার ছিল গভীর সম্পর্ক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই বর্ষার চরিত্রও বদলে গেছে। আজ বর্ষা মানেই অনেক মানুষের কাছে আনন্দ নয়, বরং উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই শহর ডুবে যায় জলাবদ্ধতায়, পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটে, নদী উপচে গ্রাম প্লাবিত হয়, আর হাজারো পরিবার মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে ফেলে ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকার শেষ সম্বল। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও এ দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রেখেছে। উত্তরে হিমালয়, পূর্বে পাহাড়ি অঞ্চল এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর- এই ভূপ্রকৃতির কারণে বর্ষাকালে উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি একসঙ্গে মিলিত হয়ে প্রায় প্রতি বছরই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্যোগের ধরন বদলে গেছে। আগে বন্যার পানি ধীরে ধীরে বাড়ত, মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেত। এখন কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণেই আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে। গভীর রাতে ঘরে পানি ঢুকে মানুষকে জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা।
চলতি বর্ষায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ধসে প্রাণহানি, বসতবাড়ি বিধ্বস্ত, কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট মানুষের দুর্ভোগকে আরও তীব্র করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, শত শত গ্রাম পানিবন্দি হয়েছে এবং বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুর্যোগের সবচেয়ে নির্মম রূপটি দেখা যায় দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবনে। একজন ক্ষুদ্র কৃষক কয়েক মাসের পরিশ্রমে যে ফসল ফলান, তা এক রাতের বন্যায় নষ্ট হয়ে যায়। একজন দিনমজুর কাজ হারিয়ে পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। বহু শিশু বই-খাতা হারিয়ে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়, যেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি নতুন সংকট সৃষ্টি করে। দুর্যোগ তাই শুধু সাময়িক ক্ষতি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করে।
তবে এই সংকটের জন্য শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তন অবশ্যই বড় কারণ, কিন্তু মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডও পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। নদী দখল, খাল ভরাট, জলাশয় ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রাকৃতিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যা। রাজধানী ঢাকা কিংবা বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জনজীবন স্থবির হয়ে পড়া তারই প্রমাণ। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানির নিচে চলে যায়। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে আসে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও যদি সেই ড্রেন খাল কিংবা নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত না থাকে, তাহলে পানি নিষ্কাশনের কোনো বাস্তব সুফল পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য ড্রেন আটকে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পাহাড়ি অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রতিবছর পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন, অবৈধ পাহাড় কাটা ও বন উজাড় পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। এ ধরনের মৃত্যু প্রকৃতির অবধারিত নিয়তি নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি আমাদের পরিকল্পনার ব্যর্থতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে, যার কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ায় চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ দেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি জলবায়ুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো- বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে দেশের অবদান খুবই সামান্য, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে এ দেশের মানুষকে। উন্নত বিশ্বের শিল্পায়ন ও অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়েছে, কিন্তু তার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্য ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সাইক্লোন প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও নগর জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে সেই সাফল্য এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, এই দুর্যোগের প্রকৃতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর তীব্রতা ও অনিশ্চয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সরকার ইতোমধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার। এছাড়াও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ হিসেবে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, হাওরের জন্য টেকসই প্রকল্প গ্রহণ উল্লেখযোগ্য। দুর্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। অনেক দুর্গম এলাকায় রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হয়। কোথাও নৌযানের সংকট, কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, আবার কোথাও পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাবে একই এলাকায় একাধিকবার ত্রাণ গেলেও অন্য এলাকা বঞ্চিত থেকে যায়। ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। এছাড়াও, দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস, ডিজিটাল সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নদী ও খাল পুনঃখনন, নগর ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং জলাভূমি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
কৃষি খাতকে জলবায়ু-সহনশীল করে গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। জলসহিষ্ণু ফসল, কৃষি বীমা, ক্ষুদ্র কৃষকদের সহজ ঋণ, দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন্যাপ্রবণ এলাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, মোবাইল মেডিকেল টিম, পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিতে হবে। শিক্ষা খাতেও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন পরিকল্পনা থাকতে হবে, যাতে কোনো শিশু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে না পড়ে। বাংলাদেশ অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় যে সাফল্য এসেছে, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছায় আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির ক্ষেত্রেও তেমন সফলতা অর্জন সম্ভব। প্রয়োজন শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ।
এই সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি নিজেরাই খাল-নদী দখল করি, ড্রেনে প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলি, জলাশয় ভরাট করি কিংবা নির্বিচারে গাছ কাটি, তাহলে দুর্যোগের জন্য শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করা যায় না। পরিবেশ রক্ষা, পানি প্রবাহ সচল রাখা এবং দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো নয়, বরং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয়।
অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল আমাদের জন্য কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু বাস্তবতার এক কঠিন পরীক্ষা। প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থানই হতে পারে নিরাপদ ভবিষ্যতের একমাত্র পথ। আজ যদি আমরা নদী, খাল, জলাভূমি ও পাহাড়কে রক্ষা করতে পারি, পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারি এবং দুর্যোগ-সহনশীল পরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে পারি, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো আবারও বর্ষাকে আশীর্বাদ হিসেবেই দেখবে, অভিশাপ হিসেবে নয়। আজকের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে দুর্যোগে বিপর্যস্ত একটি দেশ, নাকি জলবায়ু-সহনশীল, নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়নের|
