বিশ্ব পরিবেশ দিবস : টেকসই পৃথিবীর জন্য সবুজ প্রযুক্তির অঙ্গীকার
জুন ০৪ ২০২৬, ২২:৩৭
মো. আবুল কালাম আজাদ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস, ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য হলো: “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.” (প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য)। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরতে এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতি বছর ৫ জুন পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে United Nations-এর উদ্যোগে United Nations Conference on the Human Environment সম্মেলনের মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো সংকট মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন আজ আর কেবল প্রকৃতিপ্রেম নয়; এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও মানব নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বৈশ্বিক ইস্যু।
বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ইতোমধ্যে প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। Intergovernmental Panel on Climate Change-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যা দিন দিন বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এ ঝুঁকির অন্যতম শিকার। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা ইতোমধ্যে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশ দূষণের আরেকটি বড় কারণ প্লাস্টিক বর্জ্য। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টনের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়, যার বড় অংশই পুনর্ব্যবহার করা যায় না। এসব প্লাস্টিক নদী-নালা ও সাগরে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। বাংলাদেশেও নগরায়ণ ও ভোগবাদী সংস্কৃতির কারণে পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলদেশের রাজধানী বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় আজ শীর্ষে অবস্থান করছে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বায়ু ও পানি দূষণকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
তবে আশার বিষয় হলো, আধুনিক প্রযুক্তি পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট কৃষি, সবুজ স্থাপত্য এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশ “কার্বন নিরপেক্ষতা” অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রামীণ এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
পরিবেশ রক্ষায় তরুণ সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতিবান্ধব জীবনযাপনে উৎসাহিত করা জরুরি। কারণ সচেতন নাগরিকই পারে একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে।
এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সবার সামনে যে বার্তা দাঁড় করানো হয়েছে তার মর্মার্থ বিশ্লেষণে পাওয়া যায় “প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই টেকসই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।” কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ব্যক্তি, পরিবার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করতে। দৈনন্দিন জীবনে কিছু ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন—একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন, গণপরিবহন ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়, বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও পরিবেশগত ভারসাম্য ছাড়া সেই উন্নয়ন অর্থহীন। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে হবে। তাই এখনই সময় পরিবেশবান্ধব নীতি ও টেকসই জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের সেই দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়—সবুজ পৃথিবী রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এছাড়া পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ, জলাধার ও সবুজ এলাকা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ অঞ্চল থাকা প্রয়োজন, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শহরেই সেই হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। নগর উন্নয়নের নামে জলাভূমি ভরাট, খাল দখল এবং বৃক্ষ নিধনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বায়ু দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে “গ্রীণ ইকোনমি” বা সবুজ অর্থনীতির ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব শিল্প, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টেকসই অর্থনীতির প্রসারের মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকে বিশ্বে কোটি কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা কেবল ব্যয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগও বটে। বাংলাদেশে কৃষি খাতও জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মুখে রয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি এবং নদীভাঙনের কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, লবণাক্ততা সহনশীল ফসল এবং আধুনিক সেচব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা এবং রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোও জরুরি।
পরিবেশ সুরক্ষায় বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। বনভূমি কার্বন শোষণ করে জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখে এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে গাছ নিধনের কারণে বনাঞ্চল হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, অথচ বাংলাদেশে সেই হার তুলনামূলকভাবে কম। তাই সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী এবং ফলদ-বনজ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে আরও জোরদার করতে হবে।
বর্তমান সময়ে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বাড়ছে। বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন “কার্বন ফুটপ্রিন্ট” কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা, সৌরশক্তির ব্যবহার এবং শিল্পবর্জ্য শোধন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পকারখানাকে আরও টেকসই করা সম্ভব। একই সঙ্গে “সবুজ বিনিয়োগ” এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং ব্যবস্থাও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে অর্থনীতি ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিও পরিবেশ পর্যবেক্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বন উজাড়, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। স্মার্ট সিটি ধারণার মাধ্যমে বিদ্যুৎ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো যাচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি ও পরিবেশ এখন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে।
পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—সবার আচরণ ও নীতিতে পরিবেশবান্ধব পরিবর্তন আনতে হবে। আজকের ছোট উদ্যোগই আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের সেই মানবিক দায়িত্বের কথাই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
পরিবেশ সুরক্ষা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের চর্চা। প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, বাঁচবে সভ্যতা। তাই আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা সবাই একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়ে একসঙ্গে কাজ করি।
মো. আবুল কালাম আজাদ
সাবেক বিতার্কিক, বাংলাদেশ টেলিভিশন
উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার, ময়মনসিংহ কেন্দ্র।
ই-মেইল : akazaddebate@gmail.com
