এক বন্ধু কবরে আরেক বন্ধু শ্মশানে
আগস্ট ০২ ২০২৬, ১৯:৩৮
গৌরীপুরে বিশ্ব বন্ধু দিবসে দু’বন্ধু একইসাথে চিরঘুমে! এলাকায় মাতম
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে দুই বন্ধু তরিকুল ইসলাম রিয়াদ (২০) ও নাসির উদ্দিন (২৪) একসাথে রোববার (২ আগস্ট/২৬) চিরনিন্দ্রায় শায়িত হন| পাঁচাশি মধ্যপাড়া জামে মসজিদে দু’জনের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়| জানাযা শেষে বিশ্ব বন্ধু দিবসে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়| বগুড়ার কাহালুতে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে শনিবার দু’বন্ধুসহ চারজন নিহত হন|
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ছবি ফেসবুকে দেখেন পাঁচাশি গ্রামের শহিদ মিয়া| তারপর নাসির উদ্দিনের বাড়িতে ছুটে গেলে মারুফা আক্তার সনাক্ত করেন নিহতের সিরিয়ালে রয়েছেন তার স্বামী ‘নাসির উদ্দিন’ ও নাসির উদ্দিনের বন্ধু তরিকুল ইসলাম রিয়াদ| ওরা দু’বন্ধু প্রায় ৫বছর ধরে একসাথে গাড়ি চালায়| মাছ বোঝাই পিকআপ চালিয়ে বগুড়ায় যান নাসির উদ্দিন| ফেরার পথে রিয়াদকে গাড়ি চালাতে দিয়ে ঘুমিয়ে যান নাসির| এই ঘুমেই শেষ ঘুম-চিরনিন্দ্রায় দু’বন্ধুসহ ৪জন|
নাসির উদ্দিন উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের পাঁচাশী গ্রামের মৃত আজিম খানের পুত্র আর একই গ্রামের ফেরদৌস ইসলামের পুত্র হলেন রিয়াদ| মারুফা আক্তার জানায়, তার স্বামী বিকেল পর্যন্ত ঘুমিয়ে ছিলেন| সন্ধ্যায় মাছ নিয়ে বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন| তার ৫ বছরের কন্যাশিশু রয়েছে| রওনা দেয়ার আগেও মুঠোফোনে পরিবারের সদস্য ও সন্তানের খোঁজখবর নেন| দুপুরেই আগেই হয়তো বাড়ি ফিরবেন| তিনি বাড়ি ফিরেছেন, তবে লাশ হয়ে|
অপরদিকে রিয়াদের বাবা দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ্য| চার ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র কর্মক্ষম ছিলেন তিনি| তার আয়ে বাবার চিকিৎসা ও সংসার চলতো| পুত্রকে হারিয়ে বারবার মোর্ছা যাচ্ছেন তার বাবা ফেরদৌস ইসলাম| তিনি বলেন, আমার তো সবই শেষ, সড়ক আমার সব কেড়ে নিয়েছে|
এক বন্ধু কবরে আরেক বন্ধু শ্মশানে!
এ দিকে ব্যবসায়িক বন্ধু ছিলেন লুৎফুর রহমান ও শুভ দেবনাথ| দীর্ঘদিন যাবত মাছ চাষ, মৎস্য প্রজনন, মাছের খাদ্য, রোগ প্রতিরোধ ও মাছ বিক্রির শলা-পরামর্শ করতে দু’জন ভিন্নধর্মের হলেও চলতেন একসাথে| শনিবারও তার একসাথে মাছ নিয়ে যান বগুড়ায়| এ বন্ধুতে বয়স, জাত-ধর্ম নয় কর্মই ছিলো মূখ্য! শনিবার দিবাগত রাতে লাশ তাদের স্ব-স্ব বাড়িতে এসে পৌঁছে| পুরো এলাকায় মাতম শুরু হয়|
লুৎফুর রহমান ময়মনসিংহ সদর উপজেলার রাঘবপুরের তৈয়ব আলীর পুত্র| তিনি ১৯৯৭ সনে লেতু মন্ডল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজ থেকে ১৯৯৯সনে এইচএসসি ও ২০০১ সনে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন|
পারিবারিকভাবে মৎস্যচাষে বিষয়টি তিনি আয়ত্ত করে নিজে ও হাজারো যুবকদের আইডলে পরিণত হন লুৎফুর রহমান| এরপরে তিনি সাহেবকাচারী এলাকায় ভাই ভাই ফিশ সীড প্ল্যান্ট নামের একটি মৎস্য প্রতিষ্ঠান দেন| যার মাধ্যমে মাছের রেনু পোনা উৎপাদন, মাছের সুষমখাদ্য ও মাছের রোগবালাই প্রতিরোধে পরামর্শক ছিলেন| তিনি মৎস্যচাষ করে ২০১৯সনে রাষ্ট্রীয় স্বর্ণপদক অর্জন করেন|
রোববার ছিলো বিশ্ব বন্ধু দিবস| এই দিনে দুপুরে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়| মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুইপুত্র ও অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখেছেন| বন্ধু’র মৃত্যুকে শোক জানিয়ে ময়মনসিংহ ডিভিশনাল ৯৭ গ্রুপের এডমিন নাসির উদ্দিন জানায়, লুৎফুর ছিলো অত্যন্ত সাদাসিধে কর্মঠ একজন বন্ধু|
একই সাথে মৎস্যচাষে ব্যবসায়িক বন্ধুত্ব গড়ে উঠে শুভ দেবনাথের সাথে| তিনি একই এলাকার চিত্তরঞ্জন দেবনাথের পুত্র| মাছ বিক্রি শেষে ফেরার পথে দু’জন একগাড়িতে মারা যান| স্থানীয় শ্মশানে তার অন্ত্রোষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়|
