ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তায় সর্বজনীন পেনশন

অক্টোবর ০৬ ২০২৬, ১৫:২৭

ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তায় সর্বজনীন পেনশন

-: মোঃ মাসুদ মিয়া :-

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হলেও দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও কর্মজীবনের শেষ সময়ে নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তার বাইরে অবস্থান করছেন। সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে পেনশন সুবিধা ভোগ করলেও কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী, রিকশাচালক, স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোটি কোটি মানুষের বার্ধক্য অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তিগত সঞ্চয় অথবা পরিবারের ওপর। আয়ক্ষমতা কমে গেলে কিংবা কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাদের জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে, যা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আর এই কর্মসূচিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন মেলা। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শুধু অবসরকালীন একটি আর্থিক সুবিধা নয়, এটি মানুষের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। একজন নাগরিক কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় নিয়মিত অবদান রাখবেন এবং জীবনের পরবর্তী সময়ে সেই সঞ্চয়ের ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা পাবেন। এটি একটি সুদূরপ্রসারী ও সুচিন্তিত সামাজিক বিনিয়োগ। ময়মনসিংহেও প্রথমবারের মতো জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এ ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি নিবন্ধন, তথ্য গ্রহণ এবং কিস্তি জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সর্বজনীন পেনশন মেলা মূলত একটি জনসচেতনতামূলক আয়োজন, যার উদ্দেশ্য কেবল একটি সরকারি প্রকল্পের প্রচার নয়; বরং নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা। অনেকেই এখনও মনে করেন পেনশন শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়। এই ভুল ধারণা দূর করে সমাজের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ে উৎসাহিত করাই এ মেলার অন্যতম লক্ষ্য। মেলায় অংশগ্রহণকারীরা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পেনশন স্কিম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন, তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারেন এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রথম কিস্তিও জমা দিতে পারেন। এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি মানুষের মধ্যে আস্থা ও আগ্রহও বাড়ছে।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা স্কিমে সাজানো হয়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে প্রবাস স্কিম, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা জমা দিয়ে দেশে ফিরে একই সুবিধা অব্যাহত রাখা যায়। এতে প্রবাসীরা নিয়মিত সঞ্চয়ের মাধ্যমে অবসর জীবনে একটি নিশ্চিত মাসিক আয়ের নিশ্চয়তা পান। প্রগতি স্কিম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। এই স্কিমের অন্যতম আকর্ষণ হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে কর্মচারীর মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নিজে বহন করতে পারে। ফলে কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশগ্রহণে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়। সুরক্ষা স্কিম কৃষক, জেলে, তাঁতি, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সারসহ স্বকর্মে নিয়োজিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। তারা নিজেদের আয়-সামর্থ্য অনুযায়ী মাসিক চাঁদা নির্বাচন করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদে আজীবন পেনশন সুবিধা লাভ করেন। অন্যদিকে সমতা স্কিম স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে মানবিক উদ্যোগ। এ স্কিমে অংশগ্রহণকারী মাসে ৫০০ টাকা জমা দিলে সরকার সমপরিমাণ ৫০০ টাকা ভর্তুকি হিসেবে যোগ করে, অর্থাৎ মোট ১,০০০ টাকা জমা হয়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষও খুব কম ব্যয়ে পেনশন সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। চারটি স্কিমেই নিয়মিত চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে ৬০ বছর বয়সের পর আজীবন মাসিক পেনশন, নমিনি সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণেই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা কেবল একটি সঞ্চয় প্রকল্প নয়; বরং ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র- তিনটির জন্যই একটি টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই কর্মসূচির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নমনীয়তা। অংশগ্রহণকারী নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করতে পারেন এবং মাসিক, ত্রৈমাসিক কিংবা বার্ষিক ভিত্তিতে কিস্তি পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা প্রদান করলে ৬০ বছর বয়সের পর আজীবন মাসিক পেনশন পাওয়া যায়। অংশগ্রহণকারী মৃত্যুবরণ করলে নমিনির আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে এটি কেবল একজন ব্যক্তির নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষারও একটি কার্যকর ব্যবস্থা।

বর্তমান সময়ে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অধিকাংশ মানুষ স্বল্পমেয়াদি প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত থাকায় বার্ধক্যের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করেন না। ফলে কর্মক্ষমতা হারানোর পর অনেকেই অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা সেই বাস্তবতায় একটি পরিকল্পিত সমাধান। এটি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর সামাজিক সহায়তার চাপও কমাতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি সঞ্চয়ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলবে, যা উন্নত দেশের আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, অনলাইন নিবন্ধন প্ল্যাটফর্ম চালু, বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে সংযুক্তকরণ এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করেছে। ময়মনসিংহের পেনশন মেলার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সরাসরি তথ্য প্রদান, নিবন্ধন সহায়তা, প্রচারপুস্তিকা বিতরণ এবং প্রশ্নোত্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মশালা, শোভাযাত্রা, গণসচেতনতামূলক সভা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এ কর্মসূচির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে জনগণের অংশগ্রহণের ওপর। অনেকের মধ্যে এখনও ভুল ধারণা, তথ্যের ঘাটতি কিংবা আস্থার সংকট রয়েছে। এসব দূর করতে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রচার কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, কৃষক সংগঠন, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ কর্মজীবীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হলে অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।

জনগণেরও দায়িত্ব কম নয়। ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাকে বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, সরকারি তথ্যসূত্র থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা, গুজব বা বিভ্রান্তি এড়িয়ে নিবন্ধন করা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের নিয়মিত আয় রয়েছে কিন্তু কোনো অবসরভাতা বা পেনশন সুবিধা নেই, তাদের জন্য এই কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাগরিকের বার্ধক্য কতটা নিরাপদ, সেটিও উন্নয়নের অন্যতম সূচক। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা সেই নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। আর সর্বজনীন পেনশন মেলা সেই উদ্যোগকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর মাধ্যম। আজ যারা সচেতনভাবে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন, আগামী দিনের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বনির্ভর বার্ধক্যের ভিত্তি তারাই নির্মাণ করবেন। তাই সর্বজনীন পেনশনকে শুধু একটি সরকারি উদ্যোগ  হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করাই হবে সময়ের সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

লেখক: বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

সর্বশেষ সংবাদ

1 2 3 … 33