জনপ্রতি লাখ টাকায় আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দিলেন ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
মে ১৩ ২০২৬, ১৬:১১
স্টাফ রিপর্টার : ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ হাসানুল হোসেনের বিরুদ্ধে জনপ্রতি লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আত্মীয় ও কাছের লোকজন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও জেলা সিভিল সিভিল সার্জন একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।
জানা যায়, গত বছর আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মীর মাঝে ৯ জনকে বাদ দিয়ে ২ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন। নিয়োগ বাতিল হওয়া ৯ জনের দাবি ১০০ টাকা মুল্যের তিনটি স্ট্যাম্পে তাদের নিয়োগ নবায়ন করেন। নবায়নের পর জন জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা করে দাবি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। পরে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ৯ জনের নিয়োগ বাতিল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেনের স্বজন ও কাছের লোকদের কাছ থেকে জনপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে ৯ জনকে নিয়োগ দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন। সম্প্রতি এ ঘটনায় আউটসোর্সিং কর্মীরা মহাপরিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত করেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ্য করা হয়, আমরা ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আউটসোর্সিং কর্মচারী বিভিন্ন পদে কর্মরত আছি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায় ড্রিন্স সার্ভিসেস লিমিটেড। এই টিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আকতারুজ্জামান। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়োগপ্রাপ্ত হই। টানা চার মাস চাকুরী করার পর বেতন দেন। পরে ১০ মাস আমরা বিনা বেতনে কাজ করে আসছি। আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে আমাদের নিয়োগ নবায়ন করবেন। পরে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্রিন্স সার্ভিসেস লিমিটেড কাজ পায়। আমরা সকলেই সিভিল সার্জনের সঙ্গে চাকুরী নবায়নের ব্যপারে দেখা করি। সিভিল সার্জন চাকুরী বলবত থাকবে বলে নিশ্চিত করেন। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা দাবি করার বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানালে তিনি আশ্বস্থ করেন, কোন প্রকার টাকা লাগবে না। কেউ যদি টাকা দেয়, তার চাকরী থাকবে না বলেও জানান তিনি।
পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চাকরী নবায়ন করার কথা বলে বলে ১০০ টাকার ৩ করে স্টাম্পে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে আমাদের মাঝে দু’জনকে নিয়ে বাকি ৯ জনের নিয়োগ বাতিল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এদিকে, আমরা গত ১০ মাস বিনাবেতনে চাকরি করেছি এবং নিয়মিত হাজিরা দিয়েছি। তা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নিকট সংরক্ষিত আছে। পরে আমাদের নিয়োগ বাতিল করার পর ওই হাজিরা খাতা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লুকিয়ে ফেলেন এবং ১০ মাসের বেতনের কোন টাকা দেয়নি।
নিয়োগ বঞ্চিত ৯ জন হলেন- ওয়ার্ড বয় শফিকুল ইসলাম, নাজমুল হোসেন, নাজমুল হাসান আকাশ, ল্যাব সহকারি মোস্তাফিজুর রহমান, বাবুর্চি মাহমুদুল হাসান সম্রাট, ওটি পরিচারক শুক্ল দেব, আয়া তাসলিমা আক্তার, পরিচ্ছন্নতা কর্মী মোরাদ আহমেদ, নিরাপত্তা প্রহরি খাদেমুল হক।
ভুক্তভোগী বাবুর্চি মাহমুদুল হাসান সম্রাট বলেন, আমরা গত ১৪ মাস যাবত কাজ করে আসছি। এর মাঝে আমরা চার মাসের বেতন পেয়েছি। ওই চার মাসের বেতন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন বিভিন্ন অজুহাতে প্রতি জনের বেতন থেকে ৪ হাজার টাকা করে কেটে নিয়েছে। গত ১০ মাস বিনাবেতনে কাজ করেছি, নতুন চাকরীর আশায়। নিয়োগ নিশ্চিত করেও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন আমাদের নিয়োগ বাতিল করে এক থেকে দেড় লাখ টাকান বিনিময়ে তার আত্মীয় স্বজন ও পরিচিত লোকদের নিয়োগ দিয়েছে।
ল্যাব সহকারি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিয়োগ নিশ্চিত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আমাদের কাছে ৬০ হাজার করে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আমাদরর নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে ৯ জনকে জনপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা করে নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মাঝে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বজন ও পরিচিত লোক রয়েছে। আমরা ১০ মাস বিনাবেতনে চাকরী করেও কাজ পাইনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আত্মীয় সোমা আক্তার নামে একজন ল্যাব সহকারি হিসাবে নতুন নিয়েগ পেয়েছেন। নিয়োগের বিষয়ে জানতে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেন। তবে, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে তার আত্মীয়তার বিষয়টি জানতে চাইলে লাইন কেটে দেন।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মালিক আকতারুজ্জামান বলেন, আমার পছন্দ মত কোন লোক নিযোগ দেয়া হয়নি। নিয়োগের বিষয়টি সিভিল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলতে পারবেন। তাছাড়া আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই।
জানতে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন বলেন, নিয়োগ বিষয়ে আমার কোন হাত নেই। সব কার্যক্রম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের বলে লাইন কেটে দেন। পরে একাধিকবার তাকে ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সাল আহমেদ বলেন, শুধু টেন্ডার প্রক্রিয়া আমার এখানে হয়েছে। বাকি সব করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ সম্পন্য হয়েছে। আমি অনুমোদন দিয়েছি। কে নিয়োগ পেল, আর কে পেল না। তা দেখবেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে আমার কিছু করার নেই।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাঃ প্রদীপ কুমার সাহা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। তবে, নিয়োগ নিয়ে কারোর আপত্তি থাকলে তারা অভিযোগ দিতে পারে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
