দেনমোহর: পবিত্রতার প্রতীক, লোক দেখানোর বস্তু নয়! – মো: মাহবুবুল আলম সুমন
মে ০৭ ২০২৬, ০৮:৫৭
মো: মাহবুবুল আলম সুমন
বিয়ে—শুধু দুটি মানুষের একত্রে পথচলার শুরু নয়; এটি একটি পবিত্র অঙ্গীকার, একটি বিশ্বাসের বন্ধন, একটি দায়িত্বের চুক্তি। ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে যেমন সহজ, তেমনি তা গভীর মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—এই পবিত্র সম্পর্ককে আমরা নিজেরাই জটিল ও বিকৃত করে তুলছি, বিশেষ করে “দেনমোহর” নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে।
আজকের সমাজে দেনমোহর যেন আর সম্মান বা ভালোবাসার প্রতীক নয়, বরং হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা, অহংকার আর লোকদেখানোর একটি উপকরণ। বিয়ের আসরে বসে লাখ লাখ টাকার দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়—কিন্তু সেই অঙ্কের পেছনে থাকে না বাস্তবতা, থাকে না আন্তরিকতা, থাকে না পরিশোধের সক্ষমতা। প্রশ্ন হলো—এই কাগুজে প্রতিশ্রুতির মূল্য কী?
বাস্তবতা আমাদের সামনে নির্মমভাবে দাঁড়িয়ে আছে—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই দেনমোহর কখনোই আদায় হয় না। বরং বিয়ের রাতেই, দেনমোহর পরিশোধ না করেই দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। অর্থাৎ, সম্পর্কের সূচনাই হচ্ছে এক ধরনের অপূর্ণতা ও দায় এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এটা কি সেই পবিত্র সূচনা, যা ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে?
আরও উদ্বেগজনক হলো—অনেকে দেনমোহরকে ভবিষ্যতের তালাক বা বিচ্ছেদের একটি “ক্ষতিপূরণ” হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ, সম্পর্ক শুরুর আগেই ভাঙনের হিসাব কষে রাখা হচ্ছে! একটি সম্পর্ক, যা বিশ্বাস, ভালোবাসা ও স্থায়িত্বের ওপর দাঁড়ানোর কথা—সেখানে শুরুতেই অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি কেবল দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর নৈতিক অবক্ষয়ের চিহ্ন।
ইসলাম স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে—
“তোমরা তাদেরকে খুশিমনে মোহর দাও।” (সূরা নিসা: ৪)
এই “খুশিমনে” শব্দটি শুধু একটি নির্দেশ নয়; এটি একটি দর্শন। এটি বোঝায়—দেনমোহর হতে হবে আন্তরিকতার প্রকাশ, দায়িত্ববোধের প্রতীক, ভালোবাসার উপহার। এটি এমন কিছু নয় যা কাগজে লিখে রেখে ভুলে যাওয়া যাবে, কিংবা এমন অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে যা কখনোই পরিশোধ করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য নেই।
অত্যধিক দেনমোহর নির্ধারণ করে তা পরিশোধ না করা নিছক অবহেলা নয়—এটি এক ধরনের প্রতারণা। এতে বিয়ের পবিত্রতা নষ্ট হয়, সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং সমাজে ভুল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে, দেনমোহরের সৌন্দর্য তার পরিমাণে নয়—তার বাস্তবতায়। কম হোক, কিন্তু তা যেন পরিশোধযোগ্য হয়। অল্প হোক, কিন্তু তা যেন আন্তরিক হয়। বিয়ের শুরু হোক দায়িত্ববোধ দিয়ে, ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়।
আজ আমাদের প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। দেনমোহরকে “যৌতুকের বিকল্প” বা সামাজিক স্ট্যাটাসের মাপকাঠি হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। এটিকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার প্রকৃত অবস্থানে—একটি সম্মানজনক উপহার, একটি দায়িত্বের স্বীকৃতি, একটি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে।
সমাজ পরিবর্তনের বড় বড় স্লোগান দেওয়ার আগে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের পরিবার, আমাদের সিদ্ধান্ত, আমাদের বিবেক—এসব জায়গা থেকেই শুরু হোক এই পরিবর্তন।
কারণ, একটি পবিত্র সম্পর্কের সূচনা যদি পবিত্র না হয়, তবে সেই সম্পর্কের পরিণতিও কখনোই পরিপূর্ণ হতে পারে না।
মো: মাহবুবুল আলম সুমন
প্রভাষক (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি)
পলাশীহাটা স্কুল এন্ড কলেজ,
ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ।

