ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা, সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা, সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই

                                   -মোঃ মাসুদ মিয়া

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়; এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। একসময় রাজধানীকেন্দ্রিক এডিস মশাবাহিত এই রোগ বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় বিস্তার লাভ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ এখন শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়; এটি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বোপরি প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।

ডেঙ্গু মূলত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত এক ধরনের মারাত্মক ভাইরাল জ্বর, যা প্রধানত  এডিস এজিপ্টাই এবং এডিস এলবোপিকটাস জাতের স্ত্রী মশার কামড়ে ছড়ায়। এডিস মশার আচরণগত বৈশিষ্ট্য সাধারণ মশার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। এই মশা সাধারণত অন্ধকার পছন্দ করে না; মূলত ভোর বা সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার কিছু আগে সবচেয়ে বেশি কামড়ায়। পরিচ্ছন্ন ও জমে থাকা পানিতে এরা ডিম পাড়ে। আমাদের বাসাবাড়ির ফুলের টব, এসি কিংবা ফ্রিজের জমা পানি, ছাদ বা বারান্দায় পড়ে থাকা ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল বা অব্যবহৃত টায়ারে ৩ থেকে ৫ দিনের বেশি পানি জমে থাকলেই তা এডিসের আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল কৌশল হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।  বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও আইইডিসিআর-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী,  ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান স্ট্রেইন বা ধরন রয়েছে- ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ এবং ডেনভি-৪। কোনো ব্যক্তি এর একটি ধরনে আক্রান্ত হলে তার শরীরে শুধু সেটির বিরুদ্ধেই স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, বাকি তিনটি ধরন দিয়ে তিনি পুনঃসংক্রমিত হতে পারেন। বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেনভি-৩ এবং ডেনভি-২ এই দুটি ধরন বেশি সক্রিয়, যার মধ্যে ডেনভি-৩ সংক্রমণের হার ৯১ শতাংশের বেশি। ভাইরাসটি দেশের বিভিন্ন বড় শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ময়মনসিংহে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ করে অত্যন্ত তীব্র জ্বর আসা, যা ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। এর পাশাপাশি প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি, হাড় ও গাঁটে তীব্র যন্ত্রণা (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রেক বোন ফিভার’ বলা হয়) দেখা দেয়। শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ ওঠা এবং বমি ভাব বা অতিরিক্ত ক্লান্তি বোধ করা ডেঙ্গুর অন্যতম বহিঃপ্রকাশ। তবে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জটিল আকার ধারণ করতে পারে। শিশুদের মধ্যে যদি অনবরত বমি, তীব্র পেট ব্যথা, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, নিস্তেজ ভাব, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দেয়, তবে কালবিলম্ব না করে হাসপাতালে ভর্তি করানো আবশ্যক। জ্বর দেখা দিলে প্রথম ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়া যায়। এছাড়া রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট ও সিবিসি  পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। সঠিক সময়ে উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই রোগীকে সুস্থ করে তোলে। এ সময় রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার- যেমন ডাবের পানি, খাবার স্যালাইন, লেবুর শরবত ও স্যুপ পান করাতে হবে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে। জ্বর কমানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র  নির্ধারিত ডোজে প্যারাসিটামল ব্যবহার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন আর শুধু ঢাকা বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। আইইডিসিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ময়মনসিংহসহ কয়েকটি বিভাগে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি এবং আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু এখন একটি জাতীয় সংকট, যার মোকাবিলায় স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে হবে।

এই সংকট মোকাবিলায় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ‘ক্লিন সানডে’ বা ‘পরিচ্ছন্ন রবিবার’ কর্মসূচিটি আজ সারাদেশে একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। “যেখানে আমি, সেখানেই পরিচ্ছন্নতা”- এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি রবিবার জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে নিজ আঙিনা পরিষ্কার করছেন। এটি কেবল একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মাঝে সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, সরকারি অফিস, বিদ্যালয়, কলেজ, বাজার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচারণা, প্রতিটি ওয়ার্ডে লার্ভা শনাক্তকরণ কার্যক্রম, নির্মাণাধীন ভবন নিয়মিত পরিদর্শন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলছে।  এছাড়া ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের মাঝে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ অব্যাহত রয়েছে।

২০২৬ সালের  সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই দেশব্যাপী আক্রান্তের হার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার দেশব্যাপী ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ১২ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত তিন  মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় মশক নিধন, ফগিং ও বিশেষ লার্ভিসাইড প্রয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুকরণ এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোতে অন্তত পাঁচটি করে শয্যা সংরক্ষিত রাখার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো পরামর্শের জন্য স্বাস্থ্য বাতায়নের ‘৩৩৩’ নম্বর ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকির ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।

তবে কেবল সরকারি উদ্যোগ বা মশার ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। নাগরিক সচেতনতাই হতে পারে ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এডিস মশার প্রজননচক্র ভাঙতে হলে আমাদের প্রতি তিন দিনে অন্তত একবার নিজ বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করতে হবে। একটি পরিবার যদি নিজ বাড়ি পরিষ্কার রাখে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি প্রতি সপ্তাহে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে, একটি ওয়ার্ড যদি সম্মিলিতভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি নিয়মিত তদারকি করে, তাহলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফুলের টব, এসি বা ফ্রিজের ট্রেতে যেন কোনোভাবেই পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা এবং শিশুদের শরীর ঢাকা পোশাক পরানো নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের দরজা-জানালায় জালের স্ক্রিন লাগানো এবং বাইরে বের হওয়ার সময় শরীর ঢাকা পোশাক পরিধান করা উচিত। মনে রাখতে হবে, একটি বাড়ির অসচেতনতা পুরো একটি মহল্লাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো এক দিনের বা এক সপ্তাহের কাজ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক ও সমন্বিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি। সরকার, পৌরসভা, জেলা প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক- এই চার স্তম্ভের একযোগে কার্যকরের মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি ডেঙ্গুমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি। সচেতনতাই পারে আমাদের পরিবার, সন্তান ও দেশকে এই অদৃশ্য মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করতে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের লড়াই কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের নয়; এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সময়োপযোগী চিকিৎসা, কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং সর্বোপরি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। তাই আসুন, নিজের পরিবার, প্রতিবেশী এবং সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে আজ থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি এবং প্রতিটি সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি। একটি পরিচ্ছন্ন আঙিনা, একটি পরিষ্কার ছাদ, একটি সচেতন পরিবার এবং একটি দায়িত্বশীল প্রশাসনই পারে একটি নিরাপদ ময়মনসিংহ, একটি সুস্থ বাংলাদেশ এবং একটি ডেঙ্গুমুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

সর্বশেষ সংবাদ

1 2 3 … 33