ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা: ভোগান্তির চরম সীমায় রোগীরা

জুন ১৭ ২০২৬, ১৮:৪৬

জগলুল পাশা রুশো,

বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রায় দুই কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল। ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপের অজুহাতে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার বদলে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

মমেক হাসপাতালে সেবা নিতে গিয়ে অপারেশনসহ প্রতিটি পদক্ষেপে রোগী ও তাদের স্বজনদের গুণতে হচ্ছে টাকা। এরপরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। উল্টো রোগীর স্বজনদের মারধরের শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতালে কুকুর বিড়ালের অবাধ বিচরণ বাড়াচ্ছে আতংক। দেশের অন্যতম চিকিৎসাকেন্দ্র ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমন চিত্রে হতভম্ভ সাধারণ মানুষ।

রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মমেক হাসপাতালের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দালালদের প্রকাশ্য উৎপাত। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ এবং ওয়ার্ডগুলোতে দালাল ও কিছু অসাধু কর্মচারীর সিন্ডিকেট সক্রিয়। সরকারি ওষুধ বাইরে পাচার করে দেওয়া, হাসপাতালের ভেতরে থাকা রোগীদের জোরপূর্বক বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য করা এবং বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিত্যদিনের। এই সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ রোগীরা একপ্রকার জিম্মি।

হাসপাতালে শয্যা বা বেড পাওয়া যেন লটারির ভাগ্যের মতো। ধারণক্ষমতার চেয়ে ৩-৪ গুণ রোগী ভর্তি থাকায় অধিকাংশ রোগীর আশ্রয় মেলে ওয়ার্ডের মেঝেতে, বারান্দায় কিংবা নোংরা টয়লেটের পাশে। গুরুতর অসুস্থ রোগীরাও দিনের পর দিন মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা অত্যন্ত অমানবিক এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বেড নিয়ে দ্বন্দ্বে গত ৮ জুন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনদের মারধর করেছেন ওয়ার্ড বয় শাহীন। অপরদিকে সম্প্রতি রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে গাইনী ওয়ার্ডে কর্মরত এক নারীর টাকা নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় সমালোচনা।

হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ এতটাই নোংরা যে, সুস্থ মানুষও সেখানে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। ওয়ার্ডগুলোর মেঝে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। বিশেষ করে টয়লেটগুলোর অবস্থা ভয়াবহ—দুর্গন্ধ, পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনা এবং ময়লার স্তূপের কারণে ওয়ার্ডের বাতাস ভারী হয়ে থাকে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্বে চরম অবহেলা এবং তদারকির অভাব এর জন্য প্রধানত দায়ী বলছেন হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনরা।

সরকার থেকে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের দাবি করা হলেও রোগীরা নামমাত্র কিছু ওষুধ ছাড়া বাকি সব দামি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। হাসপাতালের এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনগুলো অধিকাংশ সময় ‘নষ্ট’ বা ‘অচল’ বলে বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়। রোগীদেরকে কৌশলে বাইরের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর মাধ্যমে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। আর এমআরআই বা সিটি স্ক্যান মেশিনও গত এক মাস যাবত বিকল হয়ে আছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক সিনিয়র চিকিৎসক হাসপাতালে সময়মতো আসেন না এবং রাউন্ড শেষ করেই নিজেদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর পুরো ওয়ার্ডের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় নার্স ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং বকশিস বা অতিরিক্ত টাকা দাবির অভিযোগও ওঠে। টাকা না দিলে ট্রলি বা স্ট্রেচার না মেলার ঘটনা এখানে নিয়মিত চিত্র।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের এই শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে হলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত করতে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিগুলো ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা এবং সরকারি ওষুধ বণ্টন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনাসহ চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও নার্সদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সেবার মান বাড়াতে কঠোর প্রশাসনিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং শীঘ্রই এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সমস্যা নিরসনে যুগপৎভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।  

হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.জাকির হোসেন চিকিৎসা সেবার মান নিশ্চিতকরণে ওষুধ বিতরণ, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি, দর্শনার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, দালালের দেড়াত্ম বন্ধসহ সকল ধরণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। 

সর্বশেষ সংবাদ

1 2 3 19