গাছ লাগানোর এখনই সময়: সবুজ বাংলাদেশ গড়ার জাতীয় অঙ্গীকার

জুন ১৪ ২০২৬, ১৫:৪৮

গাছ লাগানোর এখনই সময়: সবুজ বাংলাদেশ গড়ার জাতীয় অঙ্গীকার

মোঃ মাসুদ মিয়া

বাংলাদেশ আজ এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, বনভূমি ধ্বংস, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ- সব মিলিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েক দশক আগেও যে বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক, সবুজে ঘেরা এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, সেই বাংলাদেশ আজ ক্রমেই উষ্ণ, দূষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় এবং খরার মতো দুর্যোগের ঘনঘটা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারাতে শুরু করেছে। এমন এক সময়ে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, দূরদর্শী এবং জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধিত এই কর্মসূচি কেবল একটি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম নয়; বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।

প্রকৃতপক্ষে বৃক্ষ শুধু পরিবেশের অলংকার নয়, মানবসভ্যতার অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ শুধু পরিবেশকে শীতল রাখে না, বরং বহু প্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গের জীবনধারণের ভিত্তিও তৈরি করে। গাছ বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে, ভূমিক্ষয় রোধ করে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। তাই বৃক্ষরোপণকে শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক প্রয়োজন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পরিবেশবিদদের মতে, একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ সেই মানদণ্ডের তুলনায় অনেক নিচে। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিনিয়ত সবুজের পরিধি সংকুচিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবহাওয়া, কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির ওপর। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, নগরাঞ্চলে “হিট আইল্যান্ড” প্রভাব তৈরি হচ্ছে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানুষ যে তীব্র তাপদাহের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছে, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষ কাজ করতে পারেনি এবং অসংখ্য মানুষ হিট স্ট্রোক ও তাপজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর এলাকায় বৃক্ষনিধন ও সবুজায়নের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং চরম আবহাওয়ার প্রভাব অনুভব করছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তাই বৃক্ষরোপণ এখন আর কেবল পরিবেশপ্রেমীদের আহ্বান নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম হাতিয়ার।

সরকারের ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বিশেষ গুরুত্ব এখানেই যে, এটি শুধু বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তা, মহাসড়ক, রেলপথ, বাঁধ, খালপাড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং বসতবাড়িকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। ফলে এটি একটি সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা অত্যন্ত ইতিবাচক। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ উপকৃত হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন বারবার প্রমাণ করেছে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বনভূমির কোনো বিকল্প নেই। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই উপকূলজুড়ে নতুন ম্যানগ্রোভ বাগান সৃষ্টি ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে শুধু গাছ লাগালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে অতীতে বহু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে রোপিত চারার উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে রোপিত চারাগুলোর টিকে থাকার হার এবং সঠিক পরিচর্যার ওপর। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জিআইএস, রিমোট সেন্সিং এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোথায় কত গাছ লাগানো হয়েছে, কতগুলো বেঁচে আছে এবং কোথায় নতুন উদ্যোগ প্রয়োজন—এসব তথ্য সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনায় এমন প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

বৃক্ষরোপণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। ফলদ, ঔষধি এবং কাঠজাতীয় গাছ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। অনেক পরিবার বাড়ির আঙিনায় লাগানো সুপারি, আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা বা নারকেল গাছ থেকে অতিরিক্ত আয় করছে। দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ফলদ বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বৃক্ষরোপণকে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা জরুরি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে “এক শিক্ষার্থী, একটি গাছ” কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি করে সবুজ ক্যাম্পাসে রূপান্তর করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। যেমন একসময় সাক্ষরতা, টিকাদান বা স্যানিটেশন কর্মসূচি জনসচেতনতার মাধ্যমে সফল হয়েছে, তেমনি বৃক্ষরোপণকেও একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং যুবসমাজকে এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে এর প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, বিদেশি দ্রুতবর্ধনশীল গাছের পরিবর্তে দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের মধ্যে সুষম সমন্বয় থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিটি শহরে নির্দিষ্ট পরিমাণ উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, অবৈধভাবে বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং জলাশয় দখলের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বৃক্ষরোপণেসাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব কম নয়। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা, খালি জমি, রাস্তার ধারের ফাঁকা স্থান কিংবা জমির আইলে অন্তত একটি বা দুটি গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গাছ লাগিয়ে ভুলে গেলে চলবে না; নিয়মিত পরিচর্যা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন গ্রহণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাস। যদি প্রত্যেক নাগরিক অন্তত দুটি করে গাছ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে দেশে ৩৬ কোটিরও বেশি নতুন গাছ যোগ হতে পারে। এটি শুধু সরকারি লক্ষ্যমাত্রাকেই অতিক্রম করবে না, বরং দেশের পরিবেশগত চিত্রও বদলে দিতে সক্ষম হবে। আজ যখন পৃথিবী জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি, তখন একটি গাছ রোপণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ। একটি গাছ মানে শুধু একটি চারা নয়; এটি বিশুদ্ধ বাতাস, শীতল পরিবেশ, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়, খাদ্যের উৎস, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবীর প্রতীক।

বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে- গাছ লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এখনই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, তাপদাহ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আসুন আমরা সবাই বৃক্ষরোপণকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করি। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সব প্রতিষ্ঠান একযোগে এগিয়ে এলে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য শুধু পূরণই হবে না; বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই একটি সবুজ, বাসযোগ্য ও জলবায়ু সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, নির্মল ও সবুজ বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়, এটাই আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

সর্বশেষ সংবাদ

1 2 3 30