ময়মনসিংহে ক্রেতা সঙ্কটে চিন্তিত চামড়া ব্যবসায়ীরা

জুন ০৭ ২০২৬, ১৯:২৯

ময়মনসিংহে ক্রেতা সঙ্কটে চিন্তিত চামড়া ব্যবসায়ীরা

জগলুল পাশা রুশো, 

ময়মনসিংহে কোরবানীর চামড়া অধিকাংশই অবিক্রীত রয়েছে। অল্প কিছু চামড়া বিক্রী হলেও তা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেও কম দামে বিক্রী হতে দেখা গেছে। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শম্ভূগঞ্জ চামড়ার হাট ঘুরে এ চিত্রই দেখা গেছে। পাইকারী ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রচুর চামড়া এনে স্তুপ করে রেখেছে কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম না পাওয়ায় সেগুলো বিক্রী করতে পারছেন না।

হাতে গোনা দু একজন চামড়া ক্রেতা বাজারে এলেও খুবই কম দাম প্রস্তাব করছে বলে দাবী বিক্রেতাদের। তারা অভিযোগ করে বলেন এক পিস গরুর চামড়া ক্রয় করে শ্রমিক দিয়ে লবণ মিশানোর পর গড়ে ৯শ থেকে সাড়ে ৯শ টাকা খরচ পড়ছে তাদের। কিন্তু বাজারে এসে পাঁচশ টাকাও দাম পাওয়া যাচ্ছেনা। চোখে মুখে হতাশার ছাপ নিয়েই বসে থাকতে দেখা গেছে চামড়া বিক্রেতাদের। আর ছাগলের চামড়া বিক্রীর অবস্থা আরও করুণ। প্রতি পিছ ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা করে দাম দিচ্ছে ট্যানারি কর্তৃপক্ষ।

ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একটি ৬০ কেজি ওজনের লবণের বস্তা ১২শ টাকায় ক্রয় করে দৈনিক ৭শ টাকা লেবার খরচ দিয়ে এবং পরিবহন খরচ ও চামড়া ক্রয় বাবদ গড়ে প্রায় ৯শ টাকা খরচ পড়ে এক পিস চামড়ার পেছনে। এর সাথে হাটের খাজনা চামড়াপ্রতি ৪০ টাকা প্রদান করতে হয়। অথচ ট্যানারী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে সে চামড়া ৫-৬শ টাকা বিক্রী করাই দুরূহ। একটি চামড়া গড়ে ২৫ থেকে ৩০ বর্গফুট আয়তনের হলে সরকার নির্ধারিত মূল্যানুযায়ী ১৪-১৫শ টাকা হবার কথা কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত দাম মিলবে কিনা সেটা নিয়ে চিন্তিত ময়মনসিংহ অঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়িরা।

তারা আরও কয়েকজন হতাশা প্রকাশ করে বলেন যদি ট্যানারী মালিকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যেও চামড়া ক্রয় করতো তবু তাদের এত বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়তে হতোনা। ময়মনসিংহের ঈম্বরগঞ্জ উপজেলা হতে স্বাপন মিয়া দুই হাজার দুইশ পিস চামড়া শম্ভুগঞ্জ হাটে নিয়ে আসেন কিন্তু ঈদের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও একটি চামড়াও বিক্রী করতে পারেন নি। হাটে থেকে প্রতদিনিকার খরচ মেটানো বাড়তি বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে।

চামড়া বিক্রেতাদের আরেকজন গৌরিপুর উপজেলার তিলক ঋষি তিনি বলেন,  এভাবে লবণ দেওয়া চামড়া সর্বোচ্চ দুই মাস সংরক্ষণ করা যায় কিন্তু এই সময়ের মাঝে চামড়া বিক্রী করতে না পারলে তা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। ট্যানারি মালিকরা ইচ্ছে করেই সিন্ডিকেট তৈরী করে এই সঙ্কট তৈরি করছে অভিযোগ বিক্রেতাদের।

হাটে কথা হয় টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী রুহুল আমীনের সাথে। তিনি বলেন লাভের আশায় এক হাজার চামড়া ক্রয় করেছিলেন। কিন্তু হাটে এসে তার সমস্ত স্বপ্নই ধূলায় মিশে গেছে এক পিস চামড়াও বিক্রী করতে না পেরে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ব্যবসায়ী উজ্জল মিয়া ৭শ পিছ চামড়া নিয়ে এসেছিল কিন্তু উপযুক্ত দাম না পেয়ে গড়ে পাচশ টাকায় বিক্রী করেছে বাধ্য হয়েছে। সবমিলিয়ে তার বিশ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

অপরদিকে হাটের ইজারাদারদের সাথে চামড়া বিক্রয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন ইজারামূল্যের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান তারা। আশরাফ ট্রেডার্স নামের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের মো. সেলিম হোসেন এবং মো. সাকিব আকন্দ বলেন এই হাটটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচে বড় চামড়ার হাট। অন্যান্যবার প্রচুর চামড়া এলেও এবার চামড়া কম এসেছে। চামড়ার বাজারের দুরাবস্থার জন্য তাদেরও অভিযোগ ট্যানারি মালিকদের প্রতি। হাটে অন্যান্য বছর বেশ কয়েকটি ট্যানারী মালিকদের প্রতিনিধিদের দেখা যেতো চামড়ার দরদাম করতে কিন্তু এবার দু তিনজন কে দেখা গেছে মাত্র।

সালমা ট্যানারীর মার্কেটিং অফিসার মো. ইকবাল এই প্রতিবেদককে জানান, চামড়ার বাজার পরিস্থিতি এখনও নাজুক। বিদেশি বায়ার নেই, এল ডব্লিউ চুক্তির প্রভাব, কাঁচা চামড়ায় লবণের পরিমাণ কম থাকা, আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে না পারা এবং ট্যানারীগুলোতে গত ৫-৭ বছরের ওয়েট ব্লু চামড়া এখনও অবিক্রিত থাকার কারনগুলো সামগ্রীক ভাবে চামাড়ার বাজারের উপর প্রভাব পড়েছে।

আজমেরী ট্যানারীর আবু সাঈদ চামড়ার দাম কমার জন্য ল্যাম্পি স্কিন রোগকে দায়ী করে বলেন, এখানকার প্রায় গরুই এই রোগে আক্রান্ত থাকায় প্রতিটি চামড়ার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অংশ ব্যবহার অযোগ্য হওয়ায় দাম কমে আসে।

আশিকুল ইসলাম নামে অপর আরেক ক্রয় কর্মকর্তা জানান, বিদেশী বায়ারদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা, ট্যানারীগুলো আন্তর্জাতিকভাবে পরিবেশগত মানদন্ড পূরণ করতে না পারা, ইটিপি প্ল্যান্ট স্থাপন করতে না পারা, সরকারি প্রণোদনা ও ঋণ সহায়তার অপ্রতুলতা প্রভৃতি কারনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চে বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া ক্রয় করতে হচ্ছে তাদের।

সর্বশেষ সংবাদ

1 2 3 … 33