দ্রোহ, প্রেম ও মানবতার কবি নজরুল: ত্রিশাল থেকে জাতীয় চেতনার উন্মেষ – মোঃ মাসুদ মিয়া

মে ১৭ ২০২৬, ১৫:৪৭

মোঃ মাসুদ মিয়া

বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের ইতিহাসে যে কজন মহামানব যুগের সীমানা অতিক্রম করে চিরকালীন হয়ে আছেন, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের অন্যতম। তিনি কেবল একজন কবি নন; তিনি বিদ্রোহের ভাষা, প্রেমের সুর, সাম্যের আহ্বান এবং মানবমুক্তির এক অগ্নিশিখা। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ- “বল বীর; বল উন্নত মম শির!” আবার তিনিই প্রেমের গভীরতম আর্তি নিয়ে লিখেছেন- “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য।” এই দ্বৈত সত্তাই নজরুলকে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও প্রাণময় কবিতে পরিণত করেছে। দ্রোহ ও প্রেম, সাম্য ও মানবতা, ইসলামি ঐতিহ্য ও শাক্ত ভাবনা, লোকজ সুর ও আধুনিক চেতনার যে বিস্ময়কর সমন্বয় তাঁর রচনায় দেখা যায়, তা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন ভাষা ও নতুন আত্মা।

২০২৬ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উদযাপনকে ঘিরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল আবারও জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশক পর জাতীয় পর্যায়ে ত্রিশালে জন্মজয়ন্তী আয়োজনের উদ্যোগ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির শেকড়ে ফিরে যাওয়ার, জাতীয় আত্মপরিচয় পুনরাবিষ্কারের এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে পুনরায় তুলে ধরার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। 

শৈশবের দুঃখ থেকে বিদ্রোহের জন্ম

১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া, যেন ভবিষ্যৎ জীবনের এক প্রতীকী পূর্বাভাস। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে জীবিকার সংগ্রামে নামতে হয় তাঁকে। কখনো মসজিদের মুয়াজ্জিন, কখনো লেটো দলে গান রচনা ও অভিনয়, কখনো রুটির দোকানের কর্মচারী- এই কঠিন জীবনসংগ্রামই তাঁকে সাধারণ মানুষের দুঃখ ও বঞ্চনার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত করে তোলে। কৈশোরেই তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় প্রতিবাদের আগুন। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, সামন্ততন্ত্র, ধর্মান্ধতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং করাচি সেনানিবাসে অবস্থান তাঁর সাহিত্যিক চেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। সেখানে তিনি ফারসি সাহিত্য, ইসলামী দর্শন এবং বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হন। সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় এনে দেয় ছন্দের গর্জন ও সংগ্রামের ভাষা। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক বিস্ফোরণের নাম। এর মাধ্যমে নজরুল হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’। তাঁর ভাষা ছিল অগ্নিময়, অথচ সুরেলা; তাঁর কাব্যে ছিল বিপ্লব, আবার প্রেমও। 

প্রেম, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার কবি

নজরুলকে শুধু বিদ্রোহের কবি বললে তাঁর বিশালতাকে ছোট করা হয়। তিনি ছিলেন প্রেমের কবি, মানবতার কবি এবং সাম্যের কবি। তাঁর লেখনীতে ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শক্তিশালী উচ্চারণ দেখা যায়, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন-  “গাহি সাম্যের গান-; মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” হিন্দু-মুসলিম বিভক্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠস্বর। ইসলামী গজল যেমন লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত ও কীর্তনও রচনা করেছেন সমান দক্ষতায়। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল মানুষের মুক্তির পথ, বিভেদের দেয়াল নয়। নারীর অধিকার নিয়েও তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রসর। তাঁর ‘নারী’ কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে নারী-পুরুষ সমতার দৃপ্ত ঘোষণা। সমাজে নারীর অবদমন, অবহেলা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন।

ত্রিশাল: নজরুলের কবিসত্তার আদি পাঠশালা

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলাকে বলা যায় নজরুলের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯১৪ সালে আসানসোলের এক রুটির দোকান থেকে পুলিশ কর্মকর্তা কাজী রফিজউল্লাহ কিশোর নজরুলকে ত্রিশালে নিয়ে আসেন। এখানেই তাঁর জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ত্রিশালের দরিরামপুর ইংরেজি হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় তাঁকে। বর্তমানে এটি ‘ত্রিশাল সরকারি নজরুল একাডেমি’ নামে পরিচিত। কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতেন নজরুল। দরিদ্রতা ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু ছিল অদম্য মেধা ও সৃজনশীলতা। ত্রিশালের নামাপাড়ার বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে তিনি লজিং থাকতেন। শুকনিবিলের পাড়ে প্রাচীন বটগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন, গান লিখতেন, কবিতা রচনা করতেন। সেই বটতলা আজও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিশালের প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, মানুষের সরলতা এবং সংগ্রাম নজরুলের সাহিত্যিক মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এখানেই তাঁর মধ্যে মানবজীবনের বহুমাত্রিকতা উপলব্ধির সূচনা ঘটে। পরবর্তীকালে তিনি ময়মনসিংহের প্রতি নিজের ঋণের কথা স্বীকার করে লিখেছিলেন- “এই ময়মনসিংহ জেলার কাছে আমি অশেষ ঋণে ঋণী।” এই একটি বাক্যই ত্রিশালের সঙ্গে নজরুলের আত্মিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে।

প্রেমের কবি নজরুল

নজরুলের জীবনে প্রেম ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। তাঁর প্রেম কেবল নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। কুমিল্লার দৌলতপুরে তাঁর প্রথম প্রেম নার্গিসের সঙ্গে পরিচয় এবং পরে প্রমীলা দেবীর সঙ্গে পরিণয়- এই ঘটনাগুলো তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর প্রেমের গানগুলো বাংলা সংগীতের অনন্য সম্পদ। “তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়” কিংবা “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী”- এসব গান আজও বাঙালির আবেগের অংশ। প্রেম ও দ্রোহের এই অসাধারণ সমন্বয়ই নজরুলকে অনন্য করেছে। তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, তেমনি ভালোবাসার সৌন্দর্যও উদযাপন করেছেন সমান শক্তিতে।

সাংবাদিক নজরুল ও রাজনৈতিক চেতনা

নজরুল শুধু কবি নন; তিনি ছিলেন সাহসী সাংবাদিকও। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। তাঁর লেখনীতে উঠে আসে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, শোষিত মানুষের বেদনা এবং রাজনৈতিক মুক্তির ডাক। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারাগারে বসেই তিনি লেখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’- যা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়; এটি মানুষের মুক্তির অস্ত্র।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের গান ও কবিতা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। তাঁর সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং স্বাধীনতার চেতনা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১৯৭৪ সালে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। একই বছর তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আরও সুদৃঢ় করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। তাঁর প্রতি প্রদত্ত মানপত্রে তাঁকে বলা হয়েছিল বাংলা ঐতিহ্যের ‘পুনর্নির্মাতা’ ও ‘নব-ভাষ্যকার’। বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গৃহীত তাঁর গান- “চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল”- আজও জাতিকে প্রেরণা দেয়।

১২৭তম জন্মজয়ন্তী: ত্রিশালে জাতীয় উৎসবের প্রত্যাবর্তন

২০২৬ সালে ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে ১২৭তম নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ২১ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ ২৫মে প্রধানমন্ত্রী জন্মজয়ন্তীতে যোগ দিবেন। ত্রিশাল উপজেলা, জেলা প্রশাসন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এই আয়োজন বাস্তবায়নে কাজ করছে। উৎসব উপলক্ষে ত্রিশালে বইছে উৎসবের আমেজ। মাঠ সংস্কার, মঞ্চ নির্মাণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি- সব মিলিয়ে এটি পরিণত হয়েছে জাতীয় সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। উৎসবে থাকছে- নজরুল সংগীত ও আবৃত্তি, স্মারক আলোচনা, নাট্য মঞ্চায়ন, লোকজ মেলা, স্কুল-কলেজ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা, নজরুল গবেষণা বিষয়ক সেমিনার, ঐতিহ্যবাহী নজরুল মেলা, দেশের খ্যাতিমান শিল্পী, গবেষক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা এতে অংশ নেবেন। নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের চেতনাকে পৌঁছে দিতে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মীয় বিদ্বেষ, যুদ্ধ, বৈষম্য ও মানবিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে, তখন নজরুল আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। তিনি ছিলেন মানবমুক্তির কবি। তাঁর সাহিত্য মানুষকে বিভাজন নয়, ঐক্যের শিক্ষা দেয়। আজকের সমাজে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নজরুলের ভাষা হতে পারে নতুন প্রজন্মের পথনির্দেশনা। তাঁর কবিতা ও গান শুধু সাহিত্য নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক চেতনার আন্দোলন। তাঁর রচনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে অনুবাদের উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে আরবি, স্প্যানিশ, ফরাসি ও অন্যান্য বিশ্বভাষায় নজরুল সাহিত্যকে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর গানের সুর ও সাহিত্যিক বিশুদ্ধতা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল অতীতের একজন কবি নন; তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও কবি। তিনি দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন, আবার প্রেমের বাঁশিও বাজিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন মানুষই সবচেয়ে বড় পরিচয়। ত্রিশালের মাটিতে কিশোর দুখু মিয়ার যে স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ বাঙালির আত্মপরিচয়ের মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী সেই চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক ঐতিহাসিক সুযোগ। নজরুলকে স্মরণ মানে কেবল কবিকে স্মরণ করা নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, সাম্যের স্বপ্ন, মানবতার দীপ্তি এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে পুনর্জাগরিত করা। আজও তাই উচ্চারিত হয়-  “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।“

লেখকঃ

বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার

আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

 

সর্বশেষ সংবাদ

১৩

[yt_playlist_v3 mainid="xcJtL7QggTI" vdid="xcJtL7QggTI,AheYbU8J5Tc,X0zGS4-UKgg,74SZXCQb44s,2M0XCH9q3YI"]