চারটি হুইল চেয়ার বদলে দিল চার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের গল্প
জুন ১৮ ২০২৬, ১৫:৫৩
সাইফুল ইসলাম তালুকদার, ঈশ্বরগঞ্জ থেকে :
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর দারিদ্র্যের কারণে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ| কেউ বাবা-মায়ের কোলে চড়ে, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় স্কুলে আসত| কিন্তু চারটি হুইল চেয়ার তাদের জীবনে এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা, নতুন স্বপ্ন এবং স্বাধীনভাবে শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ|
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি-৪ প্রকল্পের অর্থায়নে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন চার শিক্ষার্থীর মাঝে হুইল চেয়ার বিতরণ করা হয়েছে|
গত বুধবার এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রহমান| পরে বৃহস্পতিবার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে হুইল চেয়ার তুলে দেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ আহমেদ|
এ সময় বিআরডিবি কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নন্দন কুমার দেবনাথ, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোসলেম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন|
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, হুইল চেয়ার পাওয়া শিক্ষার্থীরা হলো, মাইজবাগ ইউনিয়নের ৮১ নম্বর তারাটি নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মহিদুল্লাহ (১০), যার একটি পা অবশ| পস্তাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারমিন (১০), যার দুটি পা-ই অবশ| কাঁঠাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন (১০), যার দুটি পা নেই এবং উজানচর নওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম আক্তার (১০), যার দুটি পা-ই অবশ|
এতদিন তারা বাবা মায়ের কোলে চড়ে কিংবা হামাগুড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করত| একটি হুইল চেয়ারের অভাবে তাদের শিক্ষাজীবন নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিল| তবে এখন তারা নিজেরাই বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এমন আশায় আনন্দে ভাসছে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার|
কাঁঠাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেনের বাবা মাহবুব জানান, প্রথম শ্রেণি থেকে ছেলেকে কোলে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে লেখাপড়া করিয়েছি| এখন সে বড় হয়ে গেছে| তাকে কোলে করে স্কুলে নেওয়া অনেক কষ্টকর হয়ে পড়েছিল| হুইল চেয়ার পাওয়ার পর আমার এবং আমার ছেলের কষ্ট অনেকটাই কমে গেল|
পস্তাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শারমিনের বাবা বিল্লাল হোসেন বলেন, মেয়েকে কোলে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে সারাদিন বসে থাকতে হতো| অভাবের সংসারে এতে কোনো কাজ করতে পারতাম না| এখন হুইল চেয়ার পাওয়ায় মেয়েকে সহজে স্কুলে পাঠাতে পারব, পাশাপাশি সংসারের কাজও করতে পারব|
উজানচর নওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিম আক্তারের মা পাপিয়া বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই হুইল চেয়ার না পেলে হয়তো আমার মেয়ের লেখাপড়া এখানেই শেষ হয়ে যেত| এখন তার বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ সহজ হলো| আমরা খুব খুশি|
তারাটি নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মহিদুল্লাহও হুইল চেয়ার পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত| এতদিন বাবা মায়ের কাঁধে কিংবা কোলে ভর করে বিদ্যালয়ে যেত| এখন সে নিজের হুইল চেয়ারে করে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে|
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ আহমেদ বলেন, প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো শিশুর শিক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| একটি হুইল চেয়ারের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ুক, আমরা তা চাই না|
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রহমান বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ| শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো শিশুর শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না| সরকার চায় সব শিশুই সমান সুযোগ পেয়ে শিক্ষিত ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক| এই হুইল চেয়ার তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং শিক্ষার মূলধারায় আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে সহায়তা করবে|
