নেত্রকোণায় বোরো ফসলহানি ক্ষতিগ্রস্ত ৫৭ হাজার ৪১৩ কৃষকের তালিকা মন্ত্রণালয়ে
মে ১৯ ২০২৬, ১৭:৩১
মজিবুর রহমান, কেন্দুয়া থেকে :
নেত্রকোণার ১০টি উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫৭ হাজার ৪১৩ জন কৃষকের তালিকা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মানবিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে এ সুপারিশ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের যৌথ যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান, পাট, শাকসবজিসহ নানা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক কৃষকের বছরের একমাত্র বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে চরম সংকটে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পাঠানো তথ্যমতে, মোট ক্ষতিগ্রস্ত ৫৭ হাজার ৪১৩ জন কৃষকের মধ্যে ‘ক’ শ্রেণীতে (সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত) রয়েছেন ১৯ হাজার ১৬৯ জন, ‘খ’ শ্রেণীতে (মধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত) ২৭ হাজার ৯৮৩ জন এবং ‘গ’ শ্রেণীতে (আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত) রয়েছেন ১০ হাজার ২৬১ জন কৃষক।
উপজেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণীতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১ হাজার ৭০৪ জন। এ উপজেলায় ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণীর কোনো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নেই।
কলমাকান্দা উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ২ হাজার ৩২২ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৩ হাজার ৮৬৪ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ২ হাজার ১৩৪ জনসহ মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ৮ হাজার ৩২০ জন।
নেত্রকোণা সদর উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ১ হাজার ১২০ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৩ হাজার ২২২ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ১ হাজার ৪৫৩ জনসহ মোট ৫ হাজার ৭৯৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বারহাট্টা উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ৫৪৮ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৯৩২ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ৭৬৯ জনসহ মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ২ হাজার ২৪৯ জন।
আটপাড়া উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ২ হাজার ৩৪৬ জন, ‘খ’ শ্রেণির ২ হাজার ৮৫৪ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ৮ জনসহ মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ হাজার ২০৮ জন কৃষক।
কেন্দুয়া উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ২ হাজার ৮২১ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৫ হাজার ৬৫৩ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ৪৬৫ জনসহ মোট ৮ হাজার ৯৩৯ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মোহনগঞ্জ উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ১ হাজার ৭৩০ জন, ‘খ’ শ্রেণির ২ হাজার ৬৭৯ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ১ হাজার ৬৬ জনসহ মোট ৫ হাজার ৪৭৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মদন উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ৩ হাজার ১০৬ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৩ হাজার ৭৩৯ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ১ হাজার ৪৮৪ জনসহ মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৩২৯ জন কৃষক।
খালিয়াজুরী উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ২ হাজার ৭৪৯ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৪ হাজার ৬২৬ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ২ হাজার ৪৫৬ জনসহ মোট ৯ হাজার ৮৩১ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পূর্বধলা উপজেলায় ‘ক’ শ্রেণির ৭২৩ জন, ‘খ’ শ্রেণির ৪১৪ জন এবং ‘গ’ শ্রেণির ৪২৬ জনসহ মোট ১ হাজার ৫৬৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মুহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের যৌথ যাচাই-বাছাই শেষে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হবে। সহায়তার আওতায় নগদ অর্থ, খাদ্যশস্য, বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দ্রুত সরকারি সহায়তা পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, ফসলহানির কারণে অনেক পরিবার ঋণের বোঝা ও খাদ্যসংকটে পড়েছে। সময়মতো সহায়তা পেলে তারা আবার নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ছিল ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমি। জেলায় মোট ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে হাওরাঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদনে সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন ধান, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
