স্বজন ডেস্ক : ড্রয়ারেরাখা চোখের ড্রপের বোতলটা কবে খুলেছিলেন মনে আছে? হয়ত নেই। অনেকেই এটা মনে রাখেন না। ওষুধ আছে, তাই দিচ্ছেন— এটুকুই জানেন।
তবে চোখের ড্রপের ক্ষেত্রে এই অসচেতনতা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
গ্লুকোমার রোগী থেকে শুরু করে চোখের সাধারণ সংক্রমণ — প্রায় সব চোখের সমস্যায়ই ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। তবে এই ‘ড্রপ’ খোলার পর কতদিন ব্যবহার করা নিরাপদ, সেটা অধিকাংশ মানুষই জানেন না।
একমাস পেরোলেই ড্রপ আর নিরাপদ নয়
বাংলাদেশ আই হাসপাতালের কর্নিয়া বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন ডা. মোহাম্মদ রাশেদ আলম শান্তনু বলেন, “একবার বোতল খোলার পর সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ বা এক মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। এক মাস পার হলে বোতলে ওষুধ থাকলেও ফেলে দেওয়া উচিত।”
কথাটা কঠিন শোনালেও কারণটা একদম যুক্তিসংগত।
চোখ মানবশরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর একটি। ড্রপ খোলার পর থেকে প্রতিবার ব্যবহারে বোতলের ভেতরে বাতাস প্রবেশ করে। ড্রপারের মুখ চোখের কাছে যায়, সেখান থেকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাক বোতলের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধের রাসায়নিক উপাদানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মানে, এক মাস পরে বোতলে যা থাকে সেটা আর সেই ওষুধ নেই — বরং জীবাণু মিশ্রিত একটি দুর্বল তরল।
গ্লুকোমার রোগীদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি
গ্লুকোমা এমন একটি রোগ যেখানে চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ড্রপ দিতে হয়। অনেক রোগীই মাসের পর মাস একই বোতল থেকে ড্রপ নেন।
“তবে দীর্ঘদিন খোলা রেখে ব্যবহার করলে ‘অ্যান্টি–গ্লুকোমা ড্রপ’য়ের কার্যকারিতা কমে যায়। মানে চোখের চাপ যেটুকু নামার কথা, নামছে না। রোগী ভাবছেন ওষুধ দিচ্ছেন, কিন্তু আসলে ওষুধ কাজ করছে না। এই নীরব ক্ষতিটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক”- বলেন ডা. শান্তনু।
পাশাপাশি জীবাণু–সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গ্লুকোমার রোগীর চোখে নতুন সংক্রমণ যোগ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
আধুনিক প্রযুক্তির ড্রপ একটু বেশিদিন চলে। তবে সব ড্রপ এক নয়।
বর্তমানে বিশেষ ‘এয়ার ফিল্টার সিস্টেম’-সহ তৈরি কিছু ড্রপ পাওয়া যায়। এই বোতলে বিশেষ প্রযুক্তি থাকে, যাতে বোতল খোলার পরেও বাইরের বাতাস সরাসরি ভেতরে ঢুকতে পারে না। ফলে জীবাণু জন্মানোর ঝুঁকি অনেক কমে যায় এবং ওষুধ দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে।
এই ধরনের ড্রপ এক মাসের বেশি সময় নিরাপদে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এটা কোন ড্রপে প্রযোজ্য সেটা চিকিৎসকই বলতে পারবেন। নিজে থেকে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ড্রপ দেওয়ার নিয়মগুলোও জানা দরকার
শুধু বোতল কতদিন চলবে সেটা জানলেই হবে না। ড্রপ দেওয়ার পদ্ধতিটাও সঠিক হওয়া দরকার।
ডা. শান্তুন বলেন, “ড্রপারের মুখ কখনই চোখের পাতায়, পাপড়িতে বা আঙুলে লাগানো যাবে না। একটু ওপর থেকে ধরে ফোঁটা ফেলতে হবে। মুখ লেগে গেলে সেখান থেকে জীবাণু বোতলে ঢুকে যায়, আবার পরের বার সেই জীবাণু চোখে যায়।”
ড্রপ দেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। এটা সহজ কথা, তবে অনেকেই মানেন না।
একসঙ্গে একাধিক ড্রপ ব্যবহার করলে প্রতিটির মাঝে অন্তত পাঁচ মিনিট বিরতি দিতে হবে। একটার পরপরই আরেকটা দিলে প্রথমটা চোখ থেকে বেরিয়ে যায়, দ্বিতীয়টাও পুরোপুরি কাজ করে না। পাঁচ মিনিটের অপেক্ষাটা তাই জরুরি।
শিশু বা বয়োজ্যেষ্ঠ রোগীদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকতে হবে। তাদের চোখে ড্রপ দেওয়ার সময় মাথা স্থির রাখতে সাহায্য করুন।
বোতলে তারিখ লিখে রাখুন
এই একটা কাজ করলেই অনেক সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
“ড্রপ খোলার দিনেই বোতলের গায়ে তারিখটা লিখে রাখুন। একমাস পার হলে আর ভাববেন না। বোতলে যতটুকুই থাকুক, ফেলে দিন”- পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
অনেকের মনে হতে পারে এটা অপচয়। তবে একটু ভাবুন — চোখের সংক্রমণ হলে, চিকিৎসা করাতে যত খরচ, যত কষ্ট, তার চেয়ে কিছুটা ওষুধ ফেলে দেওয়া অনেক সস্তা।
চোখের ব্যাপারে অবহেলা মানেই ঝুঁকি
চোখ শরীরের সবচেয়ে নাজুক অঙ্গগুলোর একটি। একবার ক্ষতি হলে সেটা পুষিয়ে নেওয়া সহজ নয়।
অনেক মানুষ ব্যথা বা জ্বালা না থাকলে চোখের সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ বা জীবাণুযুক্ত ড্রপ ব্যবহারে যে সংক্রমণ হয়, সেটা শুরুতে বোঝা নাও যেতে পারে।
ধীরে ধীরে ক্ষতি হয়, যখন বোঝা যায় তখন সমস্যা অনেক বড় হয়ে গেছে।
ডা. শান্তনু বলছেন, “শুধু ওষুধ ব্যবহারই যথেষ্ট নয়, ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলাটাও সমান জরুরি। একটা ছোট সচেতনতাই পারে চোখের বড় বিপদ ঠেকাতে।”