ময়মনসিংহ সদর থানাধীন বেগুনবাড়ী স্লুইস গেট এলাকায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর ড্রামে ভর্তি বস্তাবন্দি অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে ময়মনসিংহ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)| একই সাথে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি শামীম মিয়া (৩৮)-কে গাজীপুর থেকে গ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে|
গ্রেফতারের পর নিরঞ্জন ধরকে নৃশংসভাবে খুন করার কথা শামীম মিয়া স্বীকার করে এবং ঘটনার পুরো বিবরণ দেয়| শামীমের তথ্যমতে জানা যায়, নিহত নিরঞ্জন ধরের চারটি অটোরিকশা ছিল, যা তিনি খাগডহর এলাকার ‘সততা গ্যারেজে’ রাখতেন| আসামি শামীম ওই গ্যারেজের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে| নিরঞ্জন ধর নিয়মিত শামীমের বাসায় যাতায়াত করত| শামীমের বাবা-মা বাসায় না থাকার সুযোগে শামীম তার ভাড়া বাসায় মেয়ে নিয়ে এসে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন| একদিন শামীমের অসতর্কতার সুযোগে নিরঞ্জন ধর একটি আপত্তিকর ভিডিও মোবাইলে ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা দিয়ে শামীমকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইল ও টাকা দাবি করতে থাকেন|
গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকালে শামীম তার ভাড়া বাসায় একা ঘুমানোর সময় নিরঞ্জন ধর সেখানে গিয়ে আবার টাকা দাবি করেন| এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হলে শামীম ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে থাকা পাটার শিল দিয়ে নিরঞ্জন ধরের মাথায় সজোরে আঘাত করেন| নিরঞ্জন মাটিতে পড়ে গেলে চিৎকার বন্ধ করতে শামীম তাঁর মুখে কাপড় গুঁজে দেন এবং পরবর্তীতে বটি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন| হত্যাকাণ্ডের পর শামীম লাশটি প্রথমে একটি চটের বস্তায় বেঁধে চালের ড্রামের ভেতরে ভরে তার বাসায় রাখে| পরবর্তীতে গত ২২সেপ্টেম্বর রাত অনুমান ৮টার দিকে একটি মিশুক (ইজিবাইক) এনে ড্রামটি তুলে নিয়ে বেগুনবাড়ী স্লুইস গেটের পানিতে ফেলে দিয়ে আসেন|
ঘটনার পর থেকেই পিবিআই ময়মনসিংহের একটি বিশেষ টিম ২৬ সেপ্টেম্বর অনুমান রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুরের গাছা থানাধীন বোর্ডবাজারের বটতলার সর্দার মার্কেট এলাকা থেকে প্রধান আসামি শামীম মিয়া (৩৮)কে গ্রেফতার করে| সে সেখানে তার শ্যালক মাসুদ রানার ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে ছিল| শামীম মিয়া নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার কৃষ্টপুর গ্রামের মোঃ জালাল মিয়ার ছেলে, সে ময়মনসিংহের গলগন্ডা কেরানীবাড়ী সংলগ্ন জনৈক কাওছারের বাসার ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতো|
গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে গ্রেফতারকৃত শামীমের দেখানোমতে তার ভাড়া বাসা হতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত হোতা (শিল) ও বটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়|
এ বিষয়ে পিবিআই ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান জানান, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হওয়া এই নৃশংস ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের পরপরই পিবিআই ছায়া তদন্তে নামে| পিবিআই ময়মনসিংহের সকল অফিসার ও ফোর্সের আন্তরিক ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে মূল হত্যাকারীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে| আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে|
উল্লেখ্য গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ময়মনসিংহ সদর থানাধীন বেগুনবাড়ী স্লুইস গেটে পানির নিচে ড্রামের ভেতর থেকে এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়| ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়| পরবর্তীতে নিহতের পরিবার সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেখে লাশটি নিখোঁজ স্বর্ণের কারিগর ও অটোরিকশা মালিক নিরঞ্জন ধর (৫৪)-এর বলে শনাক্ত করেন| এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সবিতা রানী ধর বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা (জিআর মামলা নং-৮৫, ধারা-৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড) দায়ের করেন| মামলাটি পিবিআই-এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় পিবিআই ময়মনসিংহ জেলা স্বউদ্যোগে এর তদন্তভার গ্রহণ করে| মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এসআই (নিঃ) মোহাম্মদ বিল্লাল মিয়া|