মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান
শিশুদের নীতিবোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, মায়া-মমতা ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীলতা জাগ্রত করতে তিনি শিক্ষক, অভিভাবক, সেলিব্রেটি ও সমাজ সংস্কারকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। বিশেষত শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের মানুষ করার কারিগর আপনারা। তাই খেয়াল রাখতে হবে কোনো শিশু যেন নির্দয় হয়ে বেড়ে না ওঠে। সেটি প্রাণী হোক বা পশু-পাখির প্রতি হোক। কারও প্রতি যেন তারা নির্দয় না হয়। তাই শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলবেন আপনারা। তিনি বলেন, দেশ গড়তে মানবিক সৈনিক দরকার। আর এই মানবিক সৈনিক আপনারা গড়ে তুলবেন। আর শিশুরা মানবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠলে মানবিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
মূল্যবোধ তৈরির কিছু পথরেখাও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন:
পাঠ্যক্রমে মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্তি: আগামী প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রমে নীতিবোধ, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার আসল কারিগর হলো শিশুরা। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নীতিবোধ, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো শিশুদের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে। সরকার আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’-কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রাথমিক শিক্ষকদের সব ধরনের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক শিক্ষা নয়, শিশুদের একদম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ভালো কাজের শক্ত বুনিয়াদ, আদর্শ এবং নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান বলেন, শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়তে আপনাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আপনারাই পারেন শিশুদের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে। তিনি বলেন, জানি, আপনাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কিছু সংকট আছে। সেগুলো আমরা সমাধানের চেষ্টা করবো। তবে আপনাদের জন্য ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আমরা করবো। যেন আপনারা অর্জিত সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারেন।
শিশুদের প্রতি আহ্বান: শিশুদের উদ্দেশে একটি অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, তোমরা চেষ্টা করবে প্রতি বছর একটি করে গাছ লাগানোর জন্য। সেটা তোমার স্কুলে হোক, সেটি তোমার বাসার আশেপাশে হোক, যেখানে যেখানে মনে করবে তোমাদের সকলের কাছে আমার অনুরোধ সেখানেই একটি গাছ রোপণ করবে। ওই গাছটি কী গাছ? ওই গাছটি কত দিন বাঁচে? ওই গাছটি কী পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করে? ওই গাছটি মানুষের কী কী উপকারে লাগে—এই বিষয়গুলো তোমরা ইন্টারনেট ঘেঁটে রিসার্চ করবে। তাহলে প্রতি বছর তুমি একটি গাছ সম্পর্কে জানতে পারবে। তিনি আরও বলেন, ‘গাছগুলো যখন বড় হবে; সেটি তোমার স্কুলেই হোক, তোমার বাসার আশেপাশে হোক, যদি স্কুলে বড় হয়, দেখবে সব বন্ধুরা যখন খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে যাবে, ওই গাছের ছায়ায় সুন্দর করে বিশ্রাম করতে পারবে। একইভাবে বাসায় যদি গাছ রোপণ করো, ওই বাসার আশেপাশে গাছটা যখন বড় হবে, যখন সুন্দর বাতাস বইবে, দেখবে সে ঘরে বসে তুমি ওই বাতাস উপভোগ করতে পারবে। পরিবেশটা অনেক ঠান্ডা হয়ে যাবে। আসো আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করি, আমাদের এই বাংলাদেশটাকে আরও সবুজ করে গড়ে তুলতে।
শিশুদের মানবিক গুণাবলির বিকাশ: শিশুদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা মানুষ, পশুপাখি বা প্রকৃতি—কারও প্রতিই নির্দয় না হয়, ছোটবেলা থেকেই তাদের সেই মানবিক শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। শিশুদের ‘মানবিক সৈনিক’ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়তে আপনাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আপনারাই পারেন শিশুদের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে। তিনি বলেন, যদি একটা মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হয়, তাহলে অবশ্যই আমাদের যে ছোট কোমলমতি শিশুরা আছে, তাদেরকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদি মানবিক মানুষ হিসেবে তাদেরকে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে মানবিক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রটি রচনা করতে পারবো।
সমাজে মুরুব্বিদের শ্রদ্ধা করা, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা এবং বিনয়ীভাবে কথা বলার মতো মৌলিক নৈতিক গুণাবলি যেন নতুন প্রজন্ম ধারণ করতে পারে, সে লক্ষ্যে সমন্বিত কাজের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মুরুব্বিদের শ্রদ্ধা করা, অসহায়কে সহযোগিতা করা, মানুষের সঙ্গে বিনয়ীভাবে কথা বলা- এই মূল্যবোধগুলো আগামী প্রজন্মের মধ্যে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে।
পিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শৈশবে একদিন আমি বাড়ির একজন কর্মচারিকে অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করলে শহীদ জিয়া বিষয়টি জানতে পারেন এবং তাকে কান ধরে সেই কর্মচারির কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। এই ঘটনাটি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার একটি বিষয়। দেশে ফেরার পরে এ রকম মূল্যবোধের অভাব অনুভব করেছি।
শহীদ জিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সৌদি আরবে ওমরা পালনকালে এক ইন্দোনেশীয় ব্যক্তি বাংলাদেশ পরিচয় শুনে সঙ্গে সঙ্গে জিয়াউর রহমান বলে ওঠেন। মানুষ শহীদ জিয়া বা বাংলাদেশ বললে দুটোকে একসঙ্গেই বুঝতো। সন্তান হিসেবে পিতার জন্য সেদিন আমি গর্ব অনুভব করেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের মূল লক্ষ্য হলো কেবল অর্থনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয় বরং নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে একটি নিরাপদ, আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তিনি একে যৌথ দায়িত্ব বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা—সবাইকে একসঙ্গে মিলে নতুন প্রজন্মের নৈতিক চরিত্র গঠনে কাজ করতে হবে।
জন্ম থেকেই শিশু মূল্যবোধ নিয়ে আসে না। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মতো মূল্যবোধেরও বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে বিকাশের মতো সুচিন্তিত উপায়ে, বস্তুত বিভিন্ন পাঠ্যক্রমিক ও সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলির মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া এবং স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলার সাহায্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুগোপযোগী মূল্যবোধগুলো বিকাশে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষক ও বাবা-মা হলেন মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাদের কেন্দ্র করেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। শিক্ষার্থীর মধ্যে মূল্যবোধের প্রসার তাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। তাদের বাদ দিয়ে সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাদের বাদ দিয়ে কোনো নৈতিক শিক্ষাও পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। তারাই মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দেন। আবার নৈতিক মূল্যবোধ ব্যতীত মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে কোমলমতি সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
সিনিয়র ডিপিআইও