রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের ইলেক্ট্রনিক শ্রমিকের চাকরির প্রলোভনে পড়ে পাচার হওয়া ময়মনসিংহের নান্দাইলের যুবক মামুন মিয়া (২৫) ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে। নিহত মামুন মিয়া উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের পুত্র।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে গত চার মাস আগে ৭ই মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামক একটি এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে আট লাখ টাকা চুক্তি করে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান মামুন মিয়া। মামুনের সাথে ৩০ জনের একটি টিম ছিল। সেখানে পৌঁছানোর মাত্র ৪ দিন পর এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট পাচারকারী চক্রটি তাঁকেসহ পুরো টিমের অন্যান্য যুবকদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেয়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের হাত অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখ সমরে মোতায়েন করা হয়।
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মামুন মিয়ার সাথে থাকা সহকর্মী ঝিনাদহের রাজন মিয়া জানান গত দুই সপ্তাহ্ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় মামুন মিয়া প্রাণ হারান। রাজন ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে আসেন।একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে নিহতের পরিবারে এখন শোকের মাতম চলছে। মামুনের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পুরো খারুয়া ইউনিয়নে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্বজনদের অভিযোগ, ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে চক্রটি প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং যুবকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ঘটনার সাথে জড়িত মানবপাচারকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয় এলাকাবাসী। একই সাথে নিহত মামুন মিয়ার মরদেহ দ্রুত সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শোকাহত পরিবার।
বুধবার দুপুরে নিহত মামুন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়- বাড়ির উঠানে ভাঙ্গা ঘরের সামনে বসে মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার কান্না করছে। সংবাদকর্মীর খবর পেয়ে আশেপাশের মানুষজন এসে ভীড় করে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন- ছেলেটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। লোভে পড়ে রাশিয়া গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দু:খজনক।
নিহতের স্ত্রী মহিমা আক্তার জানান- তার স্বামীর সাথে গত মাসের ২৬ আগস্ট শেষ বারের মত কথা হয়েছিল। তখন মামুন জানিয়েছিল যুদ্ধে আছে ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে ওয়াই-ফাই সংযোগ করে কথা বলতে এসেছে। দুই বাচ্চার নিয়ে এহন আমি কিভাবে সংসার চালাবো? মরদেহ টা কিভাবে দেশে আনবো তাও তো জানি না। সরকারের কাছে মরদেহ আনার দাবিও জানান তিনি।
নিহতের মা রোকেয়া খাতুন বলেন- সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য ৪ মাস আগে সাড়ে ৮ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ ও ধার করে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনও কারো টাকা শোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন এসে ঘুরে যাচ্ছে। এক মাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে ভাবতেও পারি না। দুইডা নাতিকে কিভাবে বড় করবো তাও বুঝতেছি না।
নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন – এবিষয়ে কোন অভিযোগ পাইনি। পরিবারের কেউ থানায় অভিযোগ দিলে আমরা আইনগত পদক্ষেপ নিব।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন- মামুনের ব্যাপারে বিষয়টি আমি জানি না। পরিবারের লোকজন আমাকে অবহিত করলে আমি বিষয়টি দেখবো।