ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সাংসদ ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর শাসনে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে উপজেলা বিএনপির দুর্দিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা| দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা| অপরদিকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষও| কর্মীদের অবমূল্যায়ন, নিজস্ব বাহিনী গঠন, স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিতে অস্ত্রের মোহরা, প্রতিপক্ষ্যের বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাঙচুর, মিথ্যা মামলায় হয়রানীর অভিযোগও রয়েছে বাচ্চুর বিরুদ্ধে| একবার বহিঃষ্কার ও শোকজের পড়েও থামেনি বাচ্চুর অপকর্ম|
জাল দলিল তৈরি করে জমি দখলের চেষ্টা এবং ওই জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার পাঁয়তারা করার অভিযোগে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাচ্চুর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছে ভালুকার একটি ভূক্তভোগি পরিবার| জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মৃত ছফির উদ্দিনের ছেলে মো. হান্নান হোসেন, মো. জাকির হোসেন, মো. সাকির হোসেন ও মো. আলম হোসেন এবং তাঁর নাতি মো. ওয়াহাব মিয়া বলেন, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাশিল মৌজার তাদের দাদা মদন শেখের নামে বাঁশিল এসএ খতিয়ান-২০ ছিল| মদন শেখের মৃত্যুর পর তাদের বাবা ছফির উদ্দিনের নামে বি.আর.এস খতিয়ান-৩৩৯ লিপিবদ্ধ হয়| ওই খতিয়ানে আটটি দাগে মোট ২ একর ৯৬ শতাংশ জমি আছে| তাদের দাবি, ছফির উদ্দিন মৃত্যুকালে দুই স্ত্রী, ছয় ছেলে, চার মেয়েসহ ১২ জন ওয়ারিশ রেখে যান| উত্তরাধিকার সূত্রে তারা দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন| সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ২ একর ১৯ শতাংশ জমির খাজনা পরিশোধ করা হয়েছে| ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৮ আগস্ট একদল লোক ওই জমি পরিদর্শনে গেলে তারা জানতে পারেন, তারা প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঢাকা বনানী শাখার কর্মকর্তা|
তাদের দাবি, এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ওই জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন| প্রতিবাদ করলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা সেখান থেকে চলে যান| পরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও (ভূমি) অফিস থেকে বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করে জানতে পারেন, তাদের পৈত্রিক জমি নিয়ে একটি জাল দলিল তৈরি করা হয়েছে| তারা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৩ ডিসে¤^রের একটি দলিলে ২ একর ১৯ শতাংশ জমি দেখিয়ে তা ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর মালিকানাধীন ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামে নামজারি করা হয়েছে|
ভুক্তভোগী পরিবারটি বলেছে, তারা নিরীহ কৃষক পরিবারের সদস্য এবং জমি নিয়ে বিরোধের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে| তারা অভিযোগের তদন্ত করে জাল দলিল বাতিল, জমি দখলের চেষ্টা বন্ধ এবং ওই জমি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের উদ্যোগ বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেন| সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবী করেন, এর আগেও এমপি বাচ্চুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা অভিযোগে তাঁকে দল থেকে বহিঃষ্কার করা হয়েছিল|
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিভিন্ন শিল্পকারখানায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বিএনপির কর্মীদের ঝুট ব্যবসা ছিনিয়ে নেওয়া, ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানী করার অভিযোগে চলতি বছরের ১৮ জুলাই বাচ্চুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি| শোকজে স্পষ্টই উল্লেখ করা হয়েছে| দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ এর আগেও তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল|
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানাযায়, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগকরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় শিল্পপতিরা| বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য হাতিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে বাচ্চু ও তার পোষ্য লোকজন|ৱ
স্থানীয় এসকিউ গ্রুপের সাথে উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক মোর্শেদ আলমের প্রায় ২২ বছরের ব্যবসা বাচ্চু কেড়ে নিয়েছে| পরিকল্পিত দুটি মিথ্যা ও সাজানো মামলায় মোর্শেদ আলমকে আসামী করা হয়েছে| মিথ্যা মামলায় আসামী করে তার মোর্শেদ আলমের কর্মী সমর্থকদের হয়রানী করা হচ্ছে| ভালুকা পৌর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ৪৪ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করে আমরা এখন আ’লীগ আমলের চেয়ে খারাপ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি| বর্তমান এমপি বাচ্চু তার সমর্থিত ব্যক্তিদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ট|
ভালুকা উপজেলা বিএনপি যুগ্ম আহবায়ক রুহুল আমীন বলেন, এমপি বাচ্চুর লোকজন বিএনপিকে দুইগ্রুপে বিভক্ত করে ফেলেছে| ৯০ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতি করি| আমাকে ২টি মিথ্যা মামলার আসামী করা হয়েছে| উপজেলার জামিরদিয়ায় অবস্থিত এনভয় টেক্সটাইল মিলের খালিড্রাম ট্রাক ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠে বাচ্চুর পোষ্য মো. ইব্রাহিম খলিল ও মো. সোহাগ মিয়ার বিরুদ্ধে| এনভয় টেক্সটাইলের নির্মাণকাজে বাধার রাখার অভিযোগও বাচ্চুর পোষ্যলোকদের বিরুদ্ধে|
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার সর্তে জানান, ভালুকায় ৪ টি বিএনপিপন্থী মালিকদের ফ্যাকটরি থেকে বাচ্চু চাঁদাবাজি করেছে| পরে সেসব মালিকরা স্থানীয়ভাবে সুরাহা না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে| স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বাচ্চুর কর্মকান্ডে একদিকে সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে| অপরদিকে বিএনপি ও সরকারের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে| বাচ্চু এমপির অপকর্ম নিয়ে দৈনিক স্বজন সহ একাধিক জাতীয় দৈনিকে সংবাদও প্রকাশিত হয়| এসব অভিযোগ ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু গণমাধ্যমকে অস্বীকার করেন|