ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায় সম্পত্তির বন্টননামা করতে গিয়ে জীবিত মা মোছাঃ নৈজবুন্নেসা ও এক বোনকে মৃত দেখিয়ে দলিল সম্পন্ন করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় দলিল লেখক ও দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. মোস্তফা কামাল এবং বড় ভাই নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এই জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কেবল এই জালিয়াতিই নয়, দলিল লেখক সমিতির সভাপতির ক্ষমতা দেখিয়ে দলিলপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ফি আদায়েরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে অভিযুক্ত ওই দলিল লেখকের বিরুদ্ধে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন উপজেলা সদরের আকনপাড়া এলাকার মৃত রমজান আলী বেশ কিছুদিন আগে ৬ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তান রেখে মারা যান। পরবর্তীতে তার বড় ছেলে নুরুল ইসলাম মা ও এক বোনকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দিয়ে শতক ভূমির বন্টননামা দলিল করার উদ্যোগ নেন। পুরো প্রক্রিয়াটির দায়িত্বে ছিলেন দলিল লেখক মো. মোস্তফা কামাল। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পরিবারের একটি পক্ষের সাথে গোপন সমঝোতা করে এই জালিয়াতি সম্পন্ন করা হয়।
জমি রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে যে ওয়ারিশ সনদ ব্যবহার করা হয়েছে, তার সত্যতা যাচাই করতে সদর ইউনিয়ন পরিষদের রেজিস্টার খাতা খতিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইকরামুল হক খসরুর স্বাক্ষর করা যে স্মারক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, সেই নম্বরে মূলত একটি জন্মসনদ দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজ তৈরি করে এই দলিল করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ভাইয়ের নাম উল্লেখ থাকলেও, চলতি বছরের ৪ মে পাঁচ ভাই, মৃত ভাইয়ের স্ত্রী সালমা খাতুন এবং তার দুই ছেলে সাব্বির হাসান ও মেহেদী হাসানের নামে বন্টননামা দলিল সম্পন্ন করেন দলিল লেখক মো. মোস্তফা কামাল। সেখানে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয় মা নৈজবুন্নেসা ও বোন ইয়াসমিন খাতুনকে।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সংবাদকর্মীরা অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, দলিলে ‘মৃত’ দেখানো সেই মা নৈজবুন্নেসা হাসিমুখে ঘরে বসে ভাত খাচ্ছেন। সাংবাদিকদের দেখে রসিকতা করে তিনি বলেন, “আমি মারা গেলে খাইতেছি কেমনে?”
তিনি জানান, তিনি যখন তার মেয়ে ইয়াসমিনের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেই সুযোগেই এই জালিয়াতির দলিল সম্পন্ন করা হয়। কম্পিউটার অপারেটর বা দলিল লেখক ভুল করে তাকে মৃত দেখিয়ে দিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন।
অন্যদিকে, সালমা খাতুন সাফাই গেয়ে বলেন, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়ার কারণে তার ছেলেদের নামে জমি বন্টন করে দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ভুক্তভোগী ইয়াসমিন আক্তার ও সাবিনা ইয়াসমিন গত ২ জুন উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন। তারা আকনপাড়া মৌজার ৪৮১, ৪৮২ ও ২৯৫ খতিয়ানের ১৮৫৭, ১৮৭৩, ৭৪, ৭৫, ৭৬ দাগে দুই একর ২১ শতক জমি এবং কান্দাপাড়া মৌজার ৩৩ খতিয়ানের ২৭৬ দাগে ১৫ শতাংশ জমির নামজারি ও জমা খারিজ স্থগিত করার দাবি জানান।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, তাদের মা ও তারা জীবিত থাকা সত্ত্বেও ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে প্রায় দুই একর ৩৬ শতক জমি বন্টন করে নেওয়া হয়েছে। দলিল লেখক সমিতির সভাপতির পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই কাজ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই জালিয়াতির দলিল বাতিল এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ও দলিল লেখক মো. মোস্তফা কামালের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে হালুয়াঘাট উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার গোলাম সারোয়ার জানান, এভাবে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে দলিল করার কোনো সুযোগ নেই। যদি এমনটা ঘটে থাকে, তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।